ভুট্টায় ভাগ্য ফিরেছে কৃষকদের

প্রকাশিত: ৩:২৯ অপরাহ্ণ, জুন ২৪, ২০২১

নিজস্ব প্রতিবেদক ; ভুট্টার বাম্পার ফলনে ভাগ্য পরিবর্তন করছেন দিনাজপুরের কৃষকরা। আদর্শ ভুট্টা চাষীরা ১৯টি উন্নত হাইব্রিড জাতের ভুট্টার আবাদ করে অধিক লাভবান হচ্ছেন।

আদর্শ ভুট্টা চাষীরা জানান, আমাদের মাঠে যখন কোন ফসল না থাকে, তখন ভুট্টা আবাদ করে মঙ্গা দূর করি। এরপর ধানসহ অন্যান্য ফসল ঘরে তুলি। বিরল উপজেলার আদর্শ কৃষক মো. মুহেব্বুল ইসলাম মনা জানান, এ বছর তিনি বিঘা প্রতি জমিতে ৭৪ মণ ভুট্টা পেয়েছেন। কৃষক হাসানুজ্জামান জানান, অতীতে আমরা বোরো ধান আবাদ করতাম। বোরো ধান আবাদে অতিরিক্ত খরচ হওয়ায় কৃষকরা ভুট্টা চাষে ঝুঁকে পড়েছেন।

ভুট্টা চাষী লতিফ জানান, আমি অন্যের জমি লিজ নিয়ে ভুট্টার আবাদ করে ৫০ শতক জমিতে এ বছর প্রায় ৮৫ মণ ভুট্টা পেয়েছেন। তিনি বলেন, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করে ভুট্টা মাড়াই মেশিনটি অনন্য অবদান রাখছে এবং আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।

ভুট্টাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দানাদার ফসলের রাণী হিসেবে গণ্য করা হয়। বাংলাদেশসহ বর্হিবিশ্বে ভুট্টার বহুবিধ ব্যবহার হচ্ছে।ভুট্টা বেকারি, পোল্ট্রি শিল্প, হাঁস-মুরগীর ও মৎস্য খামারে ভুট্টার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ভুট্টার গড় ফলনের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান এশিয়ার মধ্যে প্রথম।

দিনাজপুর ছাড়াও ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নীলফামারী, গাইবান্ধা, রংপুর, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলায়ও ভুট্টার বাম্পার ফলন হচ্ছে।

বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট দিনাজপুরের মহাপরিচালক ড. এম এছরাইল হোসেন জানান, ভুট্টা দানাদার অর্থকরী আন্তর্জাতিক মানের শস্য। এই ভুট্টার রকমারি ব্যবহার হচ্ছে। ভুট্টার তৈরি কর্ণ অয়েল (তেল), কর্ণফ্লেক্স, শিশুখাদ্য, পপকর্ণ (খইভুট্টা), সুইটকর্ণ (মিষ্টি ভুট্টা) চাষী ও ভোক্তাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কর্ণ অয়েল পুষ্টিযুক্ত, কলোষ্টেরালমুক্ত। বর্তমানে টাঙ্গাইলে নাসির গ্রুপ কোম্পানি ভুট্টার তৈল উৎপাদন করছেন। ভুট্টার আবাদ যান্ত্রিকীকরণ হওয়ায় কৃষকরা এর সুফল পাচ্ছেন।

গত ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে সারা দেশে ৫.৫৪ লক্ষ হেক্টর জমিতে ভুট্টার আবাদ হয়েছে। ৬৬.৭২ লক্ষ মেট্রিক টন ভুট্টার চাহিদার বিপরীতে ৫৪.০২ লক্ষ মেট্রিক টন ভুট্টা উৎপাদিত হয়েছে। চলতি ২০২০-২০২১ অর্থবছরে ভুট্টার ফলন স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পথে বাংলাদেশ আরো একধাপ এগিয়ে যাবে। রবি মৌসুমে বোরো আবাদে ২০-২৫টি সেচ লাগে। আর ভুট্টায় মাত্র ৩-৫ টি সেচ লাগে। ফলে উৎপাদন খরচ অনেকাংশে কমে যায়। ভুট্টা শুকিয়ে অনায়াসে ২-৩ মাস সংরক্ষণ করা যায়।

সদর উপজেলার ২নং সুন্দরবন ইউনিয়নের কালিকাপুর ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা এম এ মতিন জানান, কৃষি মন্ত্রণালয়ের দিক নির্দেশনা অনুযায়াী আমরা কৃষকদের মাঝে বীজ বপণ, চারা রোপণ, বীজ শোধন, সঠিক মাত্রায় সার প্রয়োগ, রোগ ও পোকা দমন, সেচ প্রয়োগ, আবহাওয়াজনিত বিশেষ তথ্যাদি কৃষকদের মাঝে পৌঁছাতে সক্ষম হচ্ছি। ফলে এর উপকারীতা ভুট্টা চাষীরা পেতে শুরু করেছে।

কৃষকরা বীজ সরবরাহ যেন অব্যাহত থাকে এবং নায্য মূল্যে কৃষক যেন বীজ কিনতে পারে এ ব্যাপারে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেন।

দিনাজপুর সদর উপজেলার কৃষি অফিসার শাহ্ মোহাম্মদ শাখাওয়াত জানান, সদরের দশটি ইউনিয়নে ভুট্টার বাম্পার আবাদ হচ্ছে এবং ফলনও সন্তষজনক। অদূর ভবিষ্যতে আরও আবাদ বাড়বে বলে তিনি আশাবাদী। ভুট্টা চাষীগণ ন্যায্য মুল্য পাওয়ায় ভুট্টার আবাদের দিকে ঝুঁকে পড়েছে।

দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ প্রদীপ কুমার গুহ জানান, জেলার প্রতিটি গ্রামে কম বেশি ভুট্টার আবাদ দেখা যাচ্ছে। কৃষকরা বাম্পার ফলন ও ন্যায্য মূল্য পেয়ে দারুণ খুশি এবং আনন্দিত। ভুট্টা গাছের পাতা গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া প্রিয় খাদ্য। শুকনো পাতা ও গাছ জ্বালানি হিসেবে কৃষাণীদের নিকট ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে। ভুট্টার পাতা, কান্ড, গাছ, ভুট্টার মোচা তুলে নেওয়ার পর জমিতে পড়ে থাকলে তা মাটির সাথে মিশে জৈব সার তৈরি হয়।

দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও এবং পঞ্চগড় অঞ্চলের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ সুধেন্দ্র নাথ রায় জানান, দানাদার ভুট্টা যেমন অর্থকরী ফসল, তেমনি বেকার যুবকেরা মাড়াই যন্ত্রের বদৌলতে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়ে লাভবান হচ্ছেন। অপরদিকে বেকারি শিল্পে, হাস-মুরগী, গোবাদি পশু ও মৎস্য খামারে ব্যাপক কদর রয়েছে এবং ব্যবহৃত হচ্ছে। তিনি বলেন, ভুট্টা বাংলাদেশের জন্য আর্শিবাদ স্বরুপ। কৃষকগণ এ দানাদার শস্যটির আবাদের দিকে খুবেই মনোযোগী হয়েছে। ফলে মুজিব শতবর্ষে আর এক ধাপ এগিয়ে গেল বাংলাদেশ।