ভাস্কর্যটি প্রধানমন্ত্রীকে উপহার দিতে চান নওগাঁর ফরহাদ

প্রকাশিত: ১২:২২ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ১৮, ২০২০

নাজমুল হক নাহিদ, নওগাঁ প্রতিনিধি ঃ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ব্যক্তি উদ্যোগে ৭ মার্চের ভাষণের ভাস্কর্য তৈরি করেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ফরহাদ আলী সরদার (৫৩)। এ ভাস্কর্য তৈরি করে জেলায় এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মাধ্যমে এ ভাস্কর্যটি জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষণে রাখার ইচ্ছা তার। হতদরিদ্র ফরহাদ আলী নওগাঁ শহরের কালীতলা মহল্লার কাঠহাটির মুক্তিযোদ্ধা মৃত মোজাহার আলী সরদারের ছেলে।

একটি ছবি না বলা অনেক কথা বলে দেয়। ছবি স্থান করে নেয় কতশত স্মৃতি। তেমনি তিন চাকার ওপর তৈরি ছোট একটি ‘৭ মার্চের ভাষণের ভাস্কর্য’ বাংলাদেশের ইতিহাসের অনেক কিছু জানান দিচ্ছে। সেই ভাস্কর্যে স্থান পেয়েছে ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের প্রতিচ্ছবি। একাত্তরে পাক হানাদার বাহিনীর নির্মম নির্যাতন-নিপীরন ও নির্যাতনে মারা যাওয়া বাঙালিদের মরদেহ শকূনে ছিঁড়ে খাওয়ার চিত্র, বাঙালি নারী-পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া, পাক বাহিনীর আত্মসমর্পণ, শহীদ মিনার, স্বাধীন বাংলাদেশের দুটি পতাকা, ভাষার জন্য আন্দোলনের চিত্র ফুটে উঠেছে এ ভাস্কর্যে।

এছাড়া পাকিস্থানি সেনাবাহিনীর কমান্ডিং অফিসার লে. জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজির আত্মসমর্পণের দলিলে সই করার প্রতিচ্ছবি, জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এ এইচ এম কামারুজ্জামান ও এম মনসুর আলীর ছবি। তার এ ভাস্কর্যটি দেখানোর জন্য শহরের মুক্তির মোড় শহীদ মিনারের পাশে ও জনবহুল এলাকায় রাখা হয়েছে। এছাড়া মাঝে মধ্যে ভাস্কর্যটি টেনে নিয়ে শহরের রাস্তায় প্রদক্ষিণ করেন ফরহাদ আলী। জানা গেছে, ফরহাদ আলী সরদার চার ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয়। আর্থিক দৈন্যতার করণে ১৯৭৫ সালে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। এরপর আর লেখাপড়া করা হয়নি। বর্তমানে তিনি নওগাঁ বাস মালিক সমিতিতে চেনমাস্টার করে জীবিকা নির্বাহ করেন।

সংসারে দুই ছেলে ও এক মেয়ে। স্ত্রী মাহফুজা গৃহিণী, বড় ছেলে মিনান নাওম একটি বেসরকারি ব্যাংকের অফিস সহকারী, ছোট ছেলে মাহিন আলী গার্মেন্ট দোকানের কর্মচারী ও মেয়ে ফাদিলা নুসরাত ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। মুক্তিযোদ্ধা বাবা মোজাহার আলী সরদার ২০১৪ সালে মারা গেছেন। ফরহাদ আলী সরদার চেনমাস্টারের কাজের পাশাপাশি বাড়িতে ২০১৭ সাল থেকে রড, সিমেন্ট, বালু ও পাথর দিয়ে ভাস্কর্য তৈরি শুরু করেন। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে এ ভাস্কর্যের কাজ শেষ হয়। তিনি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কোনো কারিগর না হলেও নিজ চেষ্টায় তিন বছরে এ ভাস্কর্যটি তৈরি করেছেন। ১৯৭৩ সালে তিনি যখন দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র ওই সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নওগাঁ শহরের তালতলী সড়কে এসেছিলেন।

সেই সময় তিনি বঙ্গবন্ধুকে ফুলের মালা উপহার দিয়েছিলেন। সে সুবাদে ২০০৯ সালে তালতলি থেকে দুবলিহাটি পর্যন্ত সড়কের একপাশে তালের বীজ রোপণ করেন, যা এখন দৃশ্যমান। ১৯৯৬ সাল থেকে প্রতি বছরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর স্মরণে জনগণের মাঝে সাদকায়ে জারিয়া হিসেবে গাছের চারা বিতরণ করেন। সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আব্দুল জলিল মারা যাওয়ার পর তার আত্মার মাগফিরাত কামনায় সাদকায়ে জারিয়া হিসেবে সদর উপজেলার শৈলগাছী পুরো ইউনিয়নের মসজিদ, স্কুল ও পাড়ামহল্লায় ২০১৫ সালে ৪ হাজার ৭৭৫টি তালবীজ রোপণ ও ২০৬টি জাম গাছ রোপণ করেন। ২০১৭ সালে জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলামের নামে হাসাইগাড়ী ইউনিয়ন, এম মনসুর আলীর নামে শিকারপুর ইউনিয়ন, দুবলহাটি ইউনিয়নে এ এইচ এম কামারুজ্জামানের নামে ৩ হাজার ৩৭৫টি করে এবং জেলার রানীগরের মিরাট ইউনিয়নে তাজউদ্দীন আহমদের স্মরণে ৪ হাজার ৪৭৫টি তালবীজ রোপণ করেন।

ভাস্কর্যের কারিগর ফরহাদ আলী সরদার বলেন, বাবার হাত ধরে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ শিখেছি। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে এবং জাতির সামনে ইতিহাস তুলে ধরতে মনের মাধুরী মিশিয়ে এ ভাস্কর্য তৈরি করার চেষ্টা করেছি। ভাস্কর্যটি প্রধানমন্ত্রীকে উপহার দিতে চাই। তবে এ ভাস্কর্য তৈরি করতে কত টাকা খরচ হয়েছে তা জানি না। হৃদয়ের ভালোবাসা থেকে তৈরি এ ভাস্কর্যের কাছে টাকা কিছুই না। এ ভাস্কর্য তৈরি করতে গিয়ে স্ত্রী ও সন্তানের সাথে বেশি সময় না দেয়াই অনেক কথাও শুনতে হয়েছে।

তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ আগামী প্রজন্মের মাঝে সঠিকভাবে তুলে ধরতে চাই। এতে আগামী প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করতে পারবে। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে জাতির কাছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জানানো দায়িত্ব ও কর্তব্য বলে মনে করি। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার চাওয়া আমি দরিদ্র ও ভূমিহীন। এ ভাস্কর্যটি আমার কাছে রাখার মতো জায়গা নেই। আমি মারা যাওয়ার পর আমার সন্তানেরা এটার যতœ নিতে পারবে কি-না জানি না। তবে প্রধানমন্ত্রী যদি এটা গ্রহণ করেন আমি শান্তি পেতাম। প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর প্রধানমন্ত্রীর সুস্থতা ও নিরাপদে থাকার জন্য দোয়া করি।

শহরের লাটাপাড়া মহল্লার আরেক মুক্তিযোদ্ধার সন্তান রাশেদুজ্জমান রাশেদ বলেন, ভাস্কর্যটি দেখে আমাদের খুবই ভালো লেগেছে। আগামী প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সহজেই বুঝতে পারবে। ছোট এ ভাস্কর্যের মাধ্যমে অনেক ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। এতো কষ্ট করে সুনিপুণভাবে তৈরি করায় তাকে অশেষ ধন্যবাদ জানাই। আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও নওগাঁবাসী গর্বিত। তবে ভাস্কর্যটি জাতীয় জাদুঘরে রাখলে বেশি ভালো হতো। সেখানে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা পর্যটকরা এ ভাস্কর্যটি দেখতে পারতো। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ নওগাঁ জেলার সাবেক ইউনিট কমান্ডার হারুন অল রশিদ বলেন, এটি নিঃসন্দেহে একটি ভালো উদ্যোগ। এ ভাস্কর্য থেকে আগামী প্রজন্ম খুব সহজেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বুঝতে পারবে। এমন উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই।