| | রবিবার, ৩রা ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৭ই জিলহজ্জ, ১৪৪০ হিজরী |

গান গেয়ে জীবন পার করে দিলেন চারণশিল্পী সিরাজ বাঙালী

প্রকাশিতঃ ৬:৩৫ অপরাহ্ণ | ডিসেম্বর ২৯, ২০১৭

সানোয়ারুল ইসলাম রনি, মীরসরাই চট্টগ্রাম : ধানের গানের লক্ষ প্রাণের ভালোবাসায় সিক্ত এদেশ আমার সোনার বাংলা, বাংলাদেশ। এদেশের মানুষের স্বভাব বাউলের হৃদয়ে সঙ্গীতের মূর্ছনা বয় সারাবেলা, সারাক্ষণ। এদেশের মাটিতে যুগে যুগে জন্ম নিয়েছে জানা অজানা মানবপ্রেমিক দেশপ্রেমিক শিল্পী। এদের অনেকেই স্ব-স্ব এলাকার মানুষদের মুগ্ধ করে চলে গেছেন লোকান্তরে, কেউবা রয়ে গেছেন লোকচক্ষুর অন্তরালে। আপন হৃদয়ের আকুলতায় রচিত আনন্দ ধামে বসত তাঁদের। এদের কারো কারো সঙ্গীত শুনতে পাওয়া এক বিরল সৌভাগ্যের ব্যাপার। তেমনি একজন মীরসরাইয়ের মানবপ্রেমিক দেশপ্রেমিক চারণশিল্পী সিরাজ বাঙালী।

বাঙালীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ অমিত দুঃসাহসের গৌরবগাঁথা ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি তাঁর মানসপটে ভেসে থাকে সারাবেলা। আপন মনে গানে গানে রচনা করেন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, যুদ্ধকালীন সময়ের বীরত্বগাঁথা, বাঙালীর সাহসের বিক্রমের রোমাঞ্চকর কাহিনী। তাঁর চেতনায় মুক্তিযুদ্ধ, হৃদয়ে বাংলাদেশ জেগে রয় সবসময়। নিজের লেখা ও সুরে তাঁর অবিস্মরণীয় মুক্তিযুদ্ধের গান শোনেন সকলে। ১৯৭১ এর মুক্তিযোদ্ধা লোকশিল্পী সিরাজ বাঙালীর সারা অন্তর জুড়ে বিরাজমান হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবার পরিজনদের নৃশংস হত্যাকান্ডের স্মৃতি তাঁকে ব্যাকুল করে। স্বরচিত গানে তিনি প্রকাশ করেন সেই দুঃসহ বেদনার নির্মম স্মৃতি। মুজিবপ্রেমিক চারণশিল্পী সিরাজ বাঙালী মঞ্চে মঞ্চে গেয়ে যান সেই বেদনার কাব্য।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ইতিহাস বলে/ ওরে যেইনা রবি অস্ত গেলোরে/ আঁধার হলো সোনার বাংলারে/ আর তো না উঠিল রবি বাংলা মায়ের পরে/ ওরে ২১ বছর কাটাইলো বাঙালী অমানিশার অন্ধকারে/ বঙ্গবন্ধু মুজিব নাই বাংলায়…। অপর একটি গানে তিনি গেয়েছেন- পদ্মা মেঘনা যমুনায়/বাঙালীদের বুকের রক্তের বন্যা বয়ে যায়/ ১৯৭১ সনে, ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে/ ঘোষণা দিলেন বঙ্গবন্ধু মুজিবুর রহমানে/ হয়তা আমি থাকবো না, নির্দেশ দিতে পারবোনা/ স্বাধীনতা আনবে তোমরা করিয়া লড়াই।
আজীবন রাজনীতির মাঠে গান গেয়েই স্বনামধন্য হয়েছেন সিরাজ বাঙালী। তিনি শুধু নামে বাঙালী নন, বিগদ ৫০ বছর ধরে গান গেয়ে কাজেই বাঙালীর পরিচয় দিয়ে চলেছেন। চিরায়ত বাংলার ঐশ্বর্য্যময় ঐতিহ্য লোকসংগীতশিল্পী সিরাজ বাঙালীর প্রাণের স্পন্দন। বাংলার হাট-মাঠ-ঘাট, ফুল-পাখি-নদীর গান তাঁর কণ্ঠের আবেগময়তা, আকুলতায় ভিন্ন মাত্রায় ফুটে উঠে। গণমানুষের গণসংগীত নিয়ে চারণশিল্পী সিরাজ বাঙালী হয়ে ওঠেন ব্যতিক্রমী ভিন্নতায় অদ্বিতীয় উপমা।

সিরাজ বাঙালীর প্রকৃত নাম সিরাজুল ইসলাম। ১৯৯৬ সালে চট্টগ্রাম লালদিঘীর ময়দানে অসহযোগ আন্দোলনের মঞ্চে সিরাজের গান শুনে মুগ্ধ হয়ে তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে বাঙালী উপাধিতে ভূষিত করেন।
তাঁর গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের মীরসরাইস্থ নিজামপুর এলাকার ওয়াহেদপুর গ্রামে। বাঙালী জাতির ঐতিহ্য স্মরণে তিনি রচনা করেছেন প্রায় নয় শতাধিক গান। এর মধ্যে প্রায় দু’শতাধিক গানই বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে। এ ছাড়াও যে কোন অনুষ্ঠানে তাৎক্ষণিক গান রচনা ও পরিবেশনের মাধ্যমে উপস্থিত শ্রোতাদের মুগ্ধ করার ক্ষমতা রাখেন তিনি।

৬২ বছর বয়সী এ গীতিকার ও সুরকার গান লিখেই ক্ষান্ত হননি, তিনি প্রতিটি গানে পরিবেশ ভেদে কণ্ঠও দিয়ে থাকেন গীতিকার ও সুরকার হিসাবে। ১৯৫৬ সালে জন্ম হলেও ১৯৬২ সালে তিনি মীরসরাইয়ের নিজামপুর মুসলিম হাইস্কুলে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৬৭ সালে বয়স যখন মাত্র ১০ তখন থেকেই অদ্যাবধি গণসঙ্গীতসহ সমকালীন প্রেক্ষাপট নিয়ে গান রচনা করে সেই সঙ্গে কণ্ঠও দিয়ে আসছেন। তাঁর পরিবেশনা থেকে সমকালীন প্রেক্ষাপটের আলোকে সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক মঞ্চের কথা প্রধান গানগুলো ভেসে আসে। ১৯৭২ সালে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসিতে দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। ১৯৭৪ সালে নিজামপুর কলেজ থেকে একই বোর্ডের অধীনে দ্বিতীয় বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। সেখানে পড়ালেখা থমকে দাঁড়ালেও তিনি পিছু হটেননি। এগিয়ে চলেছেন নিজের প্রতিভার গুণে। পড়ালেখায় এগুতে না পারলেও এ শিল্পী তাঁর বাঁধানো গান দিয়ে রাজনীতির মাঠ দখল করেছেন।

অজানা সব ইতিহাসের স্মৃতি নতুন প্রজন্মকে উপহার দিচ্ছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক মঞ্চ এমনকি গ্রামে-গঞ্জের হাটবাজারে। এতে করে অজানাকে জানা ও অচেনাকে চেনা হয়ে যাচ্ছে অনেকের এ শিল্পীর মাধ্যমে। তিনি শুধু এ ভাবধারায়ই নিজেকে প্রস্ফূটিত করেননি, জীবনের তাগিদে ও পারিবারিক টানে নিজেকে জড়িয়েছেন ঠিকাদারী পেশায়। মীরসরাইয়ের একজন সি গ্রেড ঠিকাদার হিসেবেও তাঁর পরিচয় রয়েছে। বর্তমানে তিনি অবসর জীবন যাপন করছেন। স্ত্রী, ৫ ছেলে ও ৬ মেয়ে নিয়ে সুখের সংসার গড়েছেন জোরারগঞ্জের মস্তাননগর এলাকার দক্ষিণ সোনাপাহাড় গ্রামে। তবে মুক্তিযুদ্ধের সময় চট্টগ্রামের ১নং সেক্টরে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধে সহযোগীতা করেছেন। তাই এ প্রতিভাবান মডেলকে সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা হিসাবেও অনেকে চেনেন।

শুধু রাজনৈতিক মাঠই নয়, তিনি বিয়ে, বিজয় মেলা, একুশ ও স্বাধীনতা মেলাসহ বিভিন্ন মেলায় ও অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করেন। পল্লীগীতি, ভাওয়াইয়া, মুর্শিদী, মারফতি, ভান্ডারী ও আধুনিক বাংলা গানেও তাঁর দক্ষতা রয়েছে। তবে নিজের রচিত গান ছাড়া অন্যের লেখা গান পরিবেশনে অভ্যস্ত নন বলে জানালেন সিরাজ বাঙালী। তিনি ঢাকার পল্টন, আজকের কাগজ প্রাঙ্গন, রমনা বটমূল, বঙ্গবন্ধু এভিনিউ, নারায়ণগঞ্জ, চাঁদপুর, চট্টগ্রামের লালদীঘি, হাটহাজারী, রাঙ্গুনিয়া, রাউজান, সীতাকুন্ড, ফটিকছড়ি, কক্সবাজার, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, সোনাগাজী, ফেনী, ছাগলনাইয়া, রামগড়সহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে তাঁর রচিত গান নিজ কণ্ঠে পরিবেশন করেছেন। শ্রোতা মুগ্ধ বিস্ময়ে শুনেছে তাঁর গান। সপ্রশংস আবেগে হাততালিতে মুখরিত হয়েছে অনুষ্ঠানস্থল। দেশে সুব্রত চৌধুরী, কান্তা নন্দী, এসডি রুবেল, লিপিকা হালদারসহ বিভিন্ন জনপ্রিয় শিল্পীদের সাথে তিনি গান গেয়েছেন।

শিল্পী সিরাজ বাঙালী জানান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আমলে আমি চট্টগ্রাম বেতারের একজন নিয়মিত শিল্পী ছিলাম। ১৯৭৩-৭৫ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রামস্থ রেডিও বাংলাদেশ কেন্দ্র থেকে অনেক গান গেয়েছি। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর আর তা সম্ভব হয়নি। ১৯৯৭ সালে ঢাকার আজকের কাগজ প্রাঙ্গনে বঙ্গবন্ধুর জীবনীর উপর লেখা গান পরিবেশন করে পরমাণু বিজ্ঞানী ও আওয়ামীলীগ নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়ার কাছ থেকে ১০হাজার টাকা পুরস্কারও পেয়েছি। এছাড়াও মীরসরাইয়ের অভিভাবক গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এমপি উনার খোঁজখবর রাখেন এবং দ্বিতীয় মেয়ের বিয়েতে মন্ত্রী ৫০ হাজার টাকাও উপহার দেন বলে জানান তিনি।

তবে এই গান গাইতে গিয়ে অনেক নির্যাতনের শিকার হন তিনি। ১৯৯৬ সালে চট্টগ্রাম লালদিঘীর ময়দানে গান গেয়ে ফেরার পথে আমবাগান এলাকা থেকে তাঁকে অপহরণ করে একদল সন্ত্রাসী পাহাড়ে নিয়ে অনেক নির্যাতন করেন। পরে পুলিশ উদ্ধার করে। একই বছর মীরসরাইয়ের বামনসুন্দর দারোগারহাট আওয়ামী মঞ্চ থেকে গান গেয়ে বাড়ি যাওয়ার পথে মিঠাছড়া এলাকায় তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোটের সন্ত্রাসীরা তাঁর উপর আক্রমন করে। ২০০১ সালে সিরাজ বাঙালীর বাড়িতে ককটেল হামলা করা হয়। অনেক হুমকি ধমকি ও প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি গান ছাড়েননি। সারাজীবন আওয়ামীলীগের আদর্শ ধারণ করে মঞ্চে গান গেয়ে কাটালেও বর্তমানে কেউ তাঁর খবর রাখেন না।

বাঙালী, বাংলা ভাষা, বাংলাদেশ মানবতাবাদী গণসংগীতশিল্পী সিরাজ বাঙালীর অহংকারী বিহ্বলতা গৌরবময় উত্তরাধিকার। বাংলার গান গেয়ে জীবন যাপন তাঁর স্বপ্নীল আকাক্সক্ষা। জীবনতো একটাই। তাই এক জীবনেই তাঁর শিল্পীসত্ত্বার সবটুকু উজাড় করে দিয়ে যেতে চান মানবতার কল্যাণে, স্বজনের শান্তি সুখের আবাস গড়তে গড়তে মরতে ইচ্ছা তাঁর। যার চেতনায় আছে বাঙালী, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ। আমৃত্যু এই চেতনা অক্ষুন্ন থাকবে বলে জানান তিনি।

Matched Content

দৈনিক সময় সংবাদ ২৪ ডট কম সংবাদের কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি,আলোকচত্রি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে র্পূব অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সর্ম্পূণ বেআইনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে কোন কমেন্সের জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।


Shares