| | মঙ্গলবার, ৮ই শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২০শে জিলক্বদ, ১৪৪০ হিজরী |

চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী যান “ঘোড়ার গাড়ী” কালের বিবর্তনে বিলুপ্তির পথে

প্রকাশিতঃ ৮:১৯ অপরাহ্ণ | জুন ২৮, ২০১৯

ফয়সাল আজম অপু, চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে : রাজশাহী বিভাগীয় শহর থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার পশ্চিমে ঐতিহ্যবাহী চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা অবস্থিত। চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ ছিল তৎকালীন গৌড় এর রাজধানী। এই এলাকায় বাংলার বহু কীর্তিমান ব্যক্তির জন্ম হয়েছে। সে সময় থেকেই যোগাযোগ ও মালামাল পরিবহনের ক্ষেত্রে বহুল ব্যবহৃত ঘোড়ার গাড়ী। আধুনিক যান্ত্রিক যানবাহনের যাতাকলে পিষ্ট হয়ে বর্তমানে প্রায় বিলুপ্তি’র পথে ঘোড়ারগাড়ী।

ইঞ্জিনের স্পর্শে আবহমান গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী অনেক যানবাহনই কালের পরিক্রমায় পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। সময় অতিবাহিত হবার সাথে সাথে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যের ধারক-বাহক অনেক বাহনেরই আমূল পরিবর্তন, আধুনিকায়ন সাধিত হয়েছে। আবার ঐতিহ্যবাহী অনেক বাহনই হারিয়ে গেছে দৃশ্যপট থেকে। তেমনি মান্ধাতা আমলের দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ঘোড়ার সাহায্যে চলমান ঘোড়ার গাড়ী বহুবিধ কারণে বর্তমানে হারিয়ে যেতে বসেছে দৃশপট থেকে। কয়েক বছর আগেও কালে ভাদ্রে দু’একটি ঘোড়ার গাড়ীর দেখা মিললেও বর্তমানে তা ডুমুরের ফুল।

বিগত তৎকালীন সময়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহকুমা শহরের সন্নিকটে মহানন্দা নদী সংলগ্ন বারোঘরিয়া বাজারে ছিলো ঘোড়ার গাড়ি স্ট্যান্ড। এখান থেকেই ঘোড়ারগাড়ী যোগে মহারাজ ঘোড়াস্ট্যান্ড, লালাপাড়া, বোলতলা, মোসাহাক সরকার মোড়, রানীহাটি, ছত্রাজিতপুর, থানা শহর শিবগঞ্জ, কানসাট, ধোবরা বাজার হয়ে গৌড়ের রাজধানি সোনামসজিদ হয়ে দেশ বিভাগের পূর্বে ভারতের মালদহ পর্যন্ত ছিলো বিস্তৃত । আবার কখোনো রিজার্ভ নিয়ে প্রত্যন্ত জণপদ ভারত ঘেষা সুন্দরপুর, পাঁকা, নারায়ণপুর, চরবাগডাঙ্গা পর্যন্ত চলে যেতে এসব ঘোড়াগাড়ী।

মালিকের স্বার্থ দেখলে চলবে না, সাংবাদিকদের শিল্পমন্ত্রী

অপরদিকে, বারোঘরিয়া থেকে দিয়ার জণপদের প্রবেশদ্বার রামচন্দ্রপুরহাট পর্যন্ত ছিলো ঘোড়ারগাড়ীতে যাতায়াত। আজও কালের সাক্ষী হয়ে আছে জেলার সদর থানার মহারাজপুর ইউনিয়নের মহারাজপুর ঘোড়াস্ট্যান্ড নামের স্টপেজ। জানা গেছে, প্রাচীনকাল থেকে গাঁও গেরামে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি করা হতো ঘোড়ার গাড়ীর অবকাঠামো। আর মহারাজপুর ঘোড়াস্ট্যান্ডে কেটে পুরিয়ে গোলাকার করে পেরেক মেরে তৈরি করা হতো চাকা। ওই গাড়ীকে টেনে নেয়ার কাজে ব্যবহার করা হতো ঘোড়াকে। কালের বিবর্তনে ও আবর্তে ঘোড়ার গাড়ীর ব্যবহার কমে যেতে থাকলেও এখনও বিশ্বে আধুনিক সকল যানবাহনের জন্য তৈরিকৃত সকল ইঞ্জিনের ক্ষমতাকে ঘোড়ার শক্তি (অশ্বশক্তি) হিসাবে পরিমাপ করা হয়ে থাকে।

যে ইঞ্জিনের অশ্বশক্তি (হর্স পাওয়ার) যত বেশী তার পরিবহন ক্ষমতা ও মূল্যও তত বেশী হয়ে থাকে। সুপ্রাচীনকাল থেকে দেশের গ্রামীণ জনপদের কাঁচা মেঠো পথে যাতায়াত ও মালামাল পরিবহনের ক্ষেত্রে গরুর গাড়ী, মহিষের গাড়ী ও ঘোড়ার গাড়ীর বহুল প্রচলণ পরিলক্ষিত হতো। কিন্তু যখন থেকে বিভিন্ন ধরনের জ্বালানী দ্বারা চালিত ইঞ্জিন দিয়ে তৈরি যানবাহনের প্রচলণ ঘটতে থাকে তখন থেকেই মান্ধাতা আমলের দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরিকৃত ‘ঘোড়ার গাড়ী’র কদর ও ব্যবহার হ্রাস পেতে থাকে।

পুলিশের কনস্টেবল নিয়োগে ৪ পুলিশের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ, আটক ২

বর্তমানে দেশের গ্রামীণ জনপদের বেশীরভাগ কাঁচা ও মেঠোপথ/সড়ককে আধুনিকায়ন করা হয়েছে। ওইসব সড়ককে পিচপাথর দিয়ে পাকা সড়কে রূপদান করা হয়েছে। সড়কে যাতায়াত ও মালামাল পরিবহনের ক্ষেত্রে জায়গা করে নিয়েছে যান্ত্রিক ইঞ্জিন দ্বারা চালিত বাস, মিনিবাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, সিএনজি অটোরিক্সা, নছিমন, করিমনরা।

নদীমাতৃক এ দেশের চরাঞ্চলে সড়ক যোগাযোগ ও মালামাল পরিবহনে দু’একটি ঘোড়ার গাড়ীর দেখা মিললেও ক্রমান্বয়ে তাও দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। ফলে প্রাচীনকাল থেকে সড়ক যোগাযোগে বহুল জনপ্রিয় ও বহুল ব্যবহৃত ‘ঘোড়ার গাড়ী’ বর্তমানে বিলুপ্ত প্রায় হয়ে পড়েছে। ঘোড়ার গাড়ীর চালক(কচুয়ান)উপরধুমি গ্রামের নাসির আলি বলেন, আমি সেই যুদ্ধের বছর থেকে ঘোড়াগাড়ী চালাইতাম তখন বারোঘরিয়া থেকে রামচন্দ্রপুরহাট এক টাকা ভাড়া ছিলো।

যান্ত্রিক গাড়ীর ভীড়ে এখন ঘোড়াগাড়ী কালের আবর্তে হারিয়ে গেলো। তাই আমি ১০ বছর আগে বাদ দিয়ে বেকার হয়ে গেছি। চক ভাগ্যবানপুর(গাইনপাড়া)গ্রামের প্রবীণ ঘোড়াগাড়ী চালক(কচুয়ান) তাজেমুল হক (তাজু) বলেন, এই ঘোড়ার গাড়ী পাকিস্তান আমল থেকে চালাই, আমি এখনো এই পেশাকে আকড়ে ধরে আছি। এর কামাই থেকেই ছেলে মেয়ে মানুষ করেছি। পুরো জেলায় শুধু আমার ঘোড়াগাড়ীটাই কালের সাক্ষী হয়ে আছে। কিন্তু আগের মত মালামাল কিংবা মানুষ বহন করা হয় না, আমার ঘোড়াটা বিক্রি করতে পারলে অন্যকাজ করতাম, ঘোড়াটা বিক্রি হয় না বলে আমি ঘোড়ার গাড়ী চালিয়ে যা পাই, তাই বহন করে কোনো রকমে সংসার চালায়।

সুন্দরবন সুরক্ষায় ব্যয় হবে ৪৬০ কোটি টাকা

মহারাজপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আলহাজ্ব এজাবুল হক বুলি জানান, জেলায় মোগল আমল হইতে এই ঘোড়ার গাড়ির প্রচলন ছিল। এখন দেশ উন্নত হয়েছে এবং ইঞ্জিন চালিত যানবাহনের অভাব নেই বলে আগের ঘোড়ার গাড়ির চাহিদা কমে গেছে। তিনি স্মৃতিচারন করে আরও বলেন, ছোটকালে মহারাজপুর ঘোড়াস্ট্যান্ডে বাবার হাত ধরে ঘোড়াগাড়ীতে উঠতাম অতপর বারোঘরিয়ায় নেমে নৌকা যোগে চাঁপাইনবাবগঞ্জ যেতাম।

Matched Content

দৈনিক সময় সংবাদ ২৪ ডট কম সংবাদের কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি,আলোকচত্রি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে র্পূব অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সর্ম্পূণ বেআইনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে কোন কমেন্সের জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।


Shares