| | শুক্রবার, ৪ঠা শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৬ই জিলক্বদ, ১৪৪০ হিজরী |

টেকনাফের শীর্ষ ইয়াবা কারবারির বাড়ি-গাড়ি ও সম্পত্তি জব্দ করা হচ্ছে

প্রকাশিতঃ ১২:২৭ পূর্বাহ্ণ | মার্চ ২৫, ২০১৯

পটিয়া (চট্টগ্রাম) থেকে সেলিম চৌধুরী : টেকনাফের শীর্ষ এক ইয়াবা ও মাদক ব্যবসায়ীর সব সম্পত্তি জব্দ করতে যাচ্ছে সরকার। ইয়াবা ও মাদক বিক্রি করে কোটিপতি বনে যাওয়া এবং বিলাসবহুল বাড়ি-গাড়ি ও জায়গা-সম্পত্তির মালিক হওয়া অবৈধভাবে সম্পত্তি অর্জনের একটি মামলায় আদালতের নির্দেশনার পর এসব সম্পত্তি জব্দের বিষয়ে ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশে এই প্রথমবারের মতো কোনো মাদক ব্যবসায়ীর সম্পত্তি জব্দ হচ্ছে।

সমাজের ক্ষতি করে অবৈধ পথে টাকা কামানো, পুলিশের তাড়া, হাজত বাস-নানা কিছু করে অর্থ-বিত্ত গড়েছে কিংবা গড়ার চেষ্টা করছে মাদক ব্যবসায়ীরা। শেষ দিকে এসে সেসব সম্পত্তি হারানোর ভীতি কাজ করছে চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ বিভিন্ন এলাকার কোটিপতি ইয়াবা ও মাদক ব্যবসায়ীদের মাঝে।

গত ৫ মার্চ কক্সবাজারের বিশেষ জজ আদালত নুরুল হক প্রকাশ ভুট্টো নামে শীর্ষ ওই মাদক ব্যবসায়ীর সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশ দেন। তার বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জে একটি মাদক মামলা তদন্ত করতে গিয়ে বিভিন্নজনের সাথে কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেনের তথ্য পায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম টিম। এ ঘটনায় মানি লন্ডারিং আইনে একটি মামলা দায়ের হয়। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ওই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম টিমের বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্যা নজরুল ইসলাম জানান, টেকনাফের এক মাদক ব্যবসায়ীর দুটি বিলাসবহুল বাড়ি ও ৯টি পতিত জায়গা ক্রোক করার বিষয়ে আদালত নির্দেশনা দেয়। আদালতের আদেশের কপি আমরা হাতে পেয়েছি ২/৩ দিন হলো। ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করেছি।

তিনি বলেন, ওই মাদক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে একটি মাদক মামলা তদন্ত করতে গিয়ে পরবর্তীতে সে সহ আরো কয়েকজনের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে সম্পত্তি অর্জনের তথ্য পাওয়া যায়। পরে ভুট্টো, তার ভাই, বাবাসহ অন্য সহযোগীদের বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। মাদক ব্যবসায়ীদের এসব অর্থ জব্দ করতে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ (সংশোধনী ২০১৫)-এর ১৪ ধারায় আসামিদের সম্পত্তি ও বাড়ি ক্রোক করার জন্য কক্সবাজারের বিশেষ জজ আদালতে একটি আবেদন করা হয় বলে জানান তিনি। দীর্ঘ দেড় বছর ধরে মাদক ব্যবসায়ী নুরুল হক প্রকাশ ভুট্টোসহ অন্যদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার তদন্ত কাজ করছেন জানিয়ে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার আরো বলেন, এ মামলাটির এখনো চার্জশিট দাখিল করা হয়নি। শীঘ্রই চার্জশিট দাখিল হবে।

মাদক ব্যবসায়ীর সম্পত্তি ক্রোকের ঘটনা বাংলাদেশে এই প্রথম বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, এর আগে কোনো মাদক ব্যবসায়ীর সম্পত্তি জব্দ করার ঘটনা ঘটেনি। অন্যান্য কোটিপতি মাদক ব্যবসায়ীদের বিষয়ে তিনি বলেন, অবৈধভাবে সম্পত্তি অর্জনের কোনো প্রমাণ পেলে মানি লন্ডারিং আইনের মাধ্যমে তাদের সম্পত্তিগুলো জব্দে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মাদক ব্যবসা করে অর্থ-বিত্ত গড়ার পর তা ধরে রাখা যায় না-এ ধরনের একটা দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন মোল্যা নজরুল ইসলাম।
সিআইডির কর্মকর্তারা বলেন, যারা সম্পদের লোভে অবৈধ মাদক ব্যবসার মাধ্যমে অর্থ আয় করেছে, তাদের জন্য এটা কড়া বার্তা। এভাবে আইনের আওতায় মাদক ব্যবসায়ীদের অর্থ-সম্পদ জব্দ করতে পারলে কেউ আর নতুন করে মাদক ব্যবসায় জড়াবে না। আমরা মনে করি, আমাদের চেষ্টার সঙ্গে সঙ্গে আদালত একটা দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিয়েছেন। এটি চলমান থাকলে সমাজে অপরাধ করে অর্থ আয়ের প্রবণতা কমে যাবে।

টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাস সাংবাদিকদের জানান, মাদক ব্যবসায়ীর সম্পত্তি ক্রোকের ব্যাপারে একটি আদেশ আজ গত ২১ মার্চ আমাদের ঊর্ধ্বতনের হাতে পৌঁছেছে বলে জানতে পেরেছি। কিন্তু এটার কপি এখনো আমার হাতে এসে পৌঁছায়নি। আদেশের কপি পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মাদক বেচে অবৈধভাবে অর্থ-বিত্তের মালিক হওয়া অন্যান্য মাদক ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রেও একই পরিণতি হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।

সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে নারায়ণগঞ্জে একটি মাদক মামলা (মামলা নং ১২, ৩ এপ্রিল ২০১৭) তদন্ত করতে গিয়ে একটি ইয়াবা সিন্ডিকেটের সন্ধান পান সিআইডির কর্মকর্তারা। এই সিন্ডিকেটের অন্যতম প্রধান হোতা টেকনাফের বাসিন্দা নুরুল হক প্রকাশ ভুট্টো। তার বাবা এজাহার মিয়া ও ভাই নূর মোহাম্মদ মিলে দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা ব্যবসা করে আসছিলেন। তাদের ৩জন মোট আটটি ব্যাংক, বিকাশের চারটি এজেন্ট ও ১৮২টি ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মাদকের অর্থ লেনদেন করতেন।

এসব সূত্র ধরে অনুসন্ধান করতে গিয়ে সিআইডির কর্মকর্তারা কোটি কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য পান। ওই বছরের ২৯ আগস্ট সিআইডি টেকনাফ থানায় মানি লন্ডারিং আইনে একটি মামলা দায়ের করে। দুই ভাই নূরুল হক ভুট্টো ও নূর মোহাম্মদ এবং বাবা এজাহার মিয়াকে প্রধান আসামি করে মামলাটি দায়ের করা হয়। এই মামলায় আসামি করা হয় তাদের ১৪ সহযোগীকেও।

এই টাকায় তারা নির্মাণ করেন দুটি বিলাসবহুল বাড়ি। কক্সবাজার শহর ও টেকনাফে নয় জায়গায় জমিও কিনেছেন। মাদকের টাকা দিয়ে করতেন বিলাসহুল জীবনযাপন। দশ বছর আগেও তারা এলাকায় রিকশা চালাতেন। এছাড়া কক্সবাজারের টেকনাফ, রাজধানীর সেনপাড়া, শেওড়াপাড়া, মিরপুরের পর্বতা, নরসিংদী, মুন্সীগঞ্জ, জয়পুরহাট ও গাজীপুরের পুবাইল থেকে একে একে এই সিন্ডিকেটের মোট ৪২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এদের মধ্যে ১৪ জন আদালত স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

এদিকে, টেকনাফে ওই মাদক ব্যবসায়ীর সম্পত্তি জব্দের পর বাকি কোটিপতি মাদক ব্যবসায়ীদের বেলায় কী হবে? চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক জানান, যারা মাদক ব্যবসায়ী আছে, তাদেরকে আইনের আওতায় আনার কাজ করছে পুলিশ। তাদের বিরুদ্ধে তদন্তে যদি অবৈধভাবে সম্পত্তি অর্জনের প্রমাণ পাওয়া যায়, সেক্ষেত্রে মানি লন্ডারিং আইন বা অন্য কোনো ব্যবস্থার মাধ্যমে তাদের সম্পত্তিগুলো জব্দ করা যায়। এসব বিষয়ে তদন্তের জন্য সিআইডিসহ অন্যান্য বিভাগ রয়েছে।

এর মধ্যে নগরীর কর্ণফুলী থানা এলাকার দুই মাদক ব্যবসায়ীর বিলাসবহুল দুটি বাড়ির খোঁজ পেয়ে সেগুলোর বিষয়ে শীঘ্রই একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছার বিষয় প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ শামসুল তাবরীজ জানান, ২ মাদক ব্যবসায়ীর বিলাসবহুল বাড়ি ২টি শনাক্তের পর ওখানে বসবাসকারীদের ঘর খালি করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে সেখানে বসবাসরতদের অনেকেই চলে গেছেন। বাকিরাও চলে যাওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছেন। ওই বাড়ি দুটি খালি হওয়ার পর একটি অভিযোগ গঠন করে এনবিআর কিংবা দুদকে পাঠানো হবে। তারা তদন্ত করে অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করে বিলাসবহুল বাড়ি দুটি জব্দের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

২ মাদক ব্যবসায়ীর মধ্যে হেলালের বিরুদ্ধে কর্ণফুলী থানায় ১৭টি মামলা রয়েছে বলে জানান ইউএনও। টেকনাফসহ বিভিন্ন থানায়ও তাদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, র‌্যাব, পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থার হাতে ধরা পড়া শীর্ষ মাদক কারবারিদের চট্টগ্রাম নগরী, কক্সবাজার, টেকনাফসহ বিভিন্ন স্থানে বিলাসবহুল বাড়ির খোঁজ পায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। বিশেষ করে ইয়াবা বিক্রি করে রাতারাতি কোটিপতি হয়েছেন তারা।

এর মধ্যে গত বছর ১৬ এপ্রিল আনোয়ারা-গহিরাভিত্তিক ইয়াবা সিন্ডিকেটের প্রধান আনোয়ারা উপজেলার রায়পুর এলাকার চান মিয়ার ছেলে মোজাহার র‌্যাবের হাতে ধরা পড়ে। র‌্যাবের পক্ষ থেকে তখন জানানো হয়েছিল, নগরীতে তার ছয়তলা বাড়ির মধ্যে দ্বিতীয় তলায় পরিবার নিয়ে তিনি থাকতেন। নগরীর সুগন্ধা আবাসিক এলাকায় তার আরো একটি বিলাসবহুল বাড়ি আছে। মোজাহার পেঁয়াজ-মরিচের পাইকারি ব্যবসার আড়ালে ইয়াবার ব্যবসার সাথে জড়িত।

গত বছরের ৮ এপ্রিল চকরিয়ার নুরুল হুদা নামে এক যুবক তার ব্যক্তিগত গাড়িসহ ধরা পড়েন ডিবি পুলিশের হাতে। ওইদিন তার কাছ থেকে ১০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছিল। সাত বছর আগে তিনি ছিলেন বাসের হেলপার। এখন চট্টগ্রাম শহরের অভিজাত এলাকার একটি ফ্ল্যাটে পরিবার নিয়ে থাকেন। মাত্র ৫-৬ বছরের মধ্যে তিনি কয়েক কোটি টাকার মালিক। গাড়ি আছে দুটি। বিউটি পার্লার খুলে দিয়েছেন স্ত্রীকে। রয়েছে মুঠোফোনের দোকান। জমি কিনেছেন কক্সবাজার শহরে।

গত ৪ মে নগরীর হালিশহরের শ্যামলী হাউজিং সোসাইটির একটি ফ্লাটে ধরা পড়ে ইয়াবার সবচেয়ে বড় চালান। নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মো. কামরুজ্জামানের নেতৃত্বে পরিচালিত ওই অভিযানে ১৩ লাখ ইয়াবাসহ আশরাফ (৩৪) ও হাসান (২৪) নামে দুই ভাইকে গ্রেপ্তার হয়। এর মধ্যে আশরাফ ছিলেন সৌদি আরব প্রবাসী। তাদের বাড়ি বান্দরবানে। পুলিশ জানায়, আশরাফ প্রবাস জীবনে উন্নতি করতে না পারলেও দেশে এসে মাত্র ২ বছরের মধ্যে কোটিপতি বনে গেছেন। শ্যামলী হাউজিং সোসাইটির ওই ফ্লাট ছাড়াও নাসিরাবাদে একটি ফ্লাট ও বাকলিয়ায় একটি প্লটের মালিক তিনি। রয়েছে ২ গাড়ি।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাদক ব্যবসায়ীর তালিকায় শীর্ষে আছেন রশীদ খুলু (৫০) ও তার পুত্র ফয়সাল রশীদ। (৩৩)। হালিশহর থানাধীন কর্ণফুলী আবাসিক এলাকা ও শ্যামলী আবাসিক এলাকায় দুটি বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে তাদের। ২০১২ সালে নগরীর আছদগঞ্জে সর্ববৃহৎ ইয়াবার (প্রায় তিন লাখ পিস) চালান নিয়ে ধরা পড়েন রশীদ খুলু।

আরেক ইয়াবা ব্যবসায়ী জিয়াউর রহমান ৯/১০ বছর আগেও ছিলেন বেকার। টেকনাফ মৌলভীপাড়ার চোরাচালানের ঘাট নিয়ন্ত্রণকারী হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার পর ইয়াবা পাচার শুরু করেন। এখন দুটি মাইক্রোবাস ও চারটি ভারতীয় বিভিন্ন মডেলের দ্রুতগামী বাইকের মালিক। একটি আলিশান বাড়িও বানিয়েছেন। তার ছোট ভাই আবদুর রহমান ও কামাল হোসেন ইয়াবা ব্যবসায় সক্রিয়।

সম্প্রতি টেকনাফে একসঙ্গে শতাধিক মাদক ব্যবসায়ীর আত্মসমর্পণের পর তাদের বিলাসবহুল বাড়ি ও অর্থ-সম্পত্তির বিষয়ে কী হবে, তা নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। এই মামলার পর পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, মানি লন্ডারিং আইনে অনুসন্ধান করে মাদক ব্যবসায়ীদের সম্পত্তি এভাবে জব্দ করতে পারলে তাদের প্রতিরোধ করা সহজ হবে। ফলে আত্মসমর্পণ করেও কেউ অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ ভোগ করতে পারবে না।

Matched Content

দৈনিক সময় সংবাদ ২৪ ডট কম সংবাদের কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি,আলোকচত্রি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে র্পূব অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সর্ম্পূণ বেআইনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে কোন কমেন্সের জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।


Shares