| | বুধবার, ৩রা আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৯শে মুহাররম, ১৪৪১ হিজরী |

কোটি কোটি টাকা চলে যাচ্ছে ভারতে চিকিৎসায় ভারত নির্ভরতা বাড়ছে বাংলাদেশিদের

প্রকাশিতঃ ১১:৪০ অপরাহ্ণ | মার্চ ০৭, ২০১৯

পটিয়া (চট্টগ্রাম) থেকে সেলিম চৌধুরী : বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার বাংলাদেশি চিকিৎসার জন্য ছুটে যাচ্ছেন প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে। বেশির ভাগ মানুষ যাচ্ছেন ভারতের চেন্নাই, ভেলোর, বেঙ্গালুরু ও কলকাতায়। এছাড়াও দিল্লী ও হায়দ্রাবাদেও যাচ্ছেন অনেকেই। সহনীয় খরচে উন্নত চিকিৎসার আশায় বাংলাদেশিদের মধ্যে ভারত-নির্ভরতা বেড়েই চলেছে দিন দিন। বাংলাদেশের চিকিৎসকদের রোগী হয়রানীসহ নানান অভিযোগ রয়েছে।

এর ফলে জটিল ও কঠিন রোগ ছাড়াও সামান্য রোগের জন্যই ভারতে ছুটে যাচ্ছেন বাংলাদেশিরা। প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা চলে যাচ্ছে ভারতে। ভারতগামী পর্যটকের মতো চিকিৎসা খাতও এখন বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে। এই সুযোগে বাংলাদেশি রোগীদের টানতে ভিসা পদ্ধতি সহজ করেছে ভারত সরকার।

চট্টগ্রামের ভারতীয় সহকারী হাই কমিশনার কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, গত বছর (২০১৮ সাল) চট্টগ্রাম থেকে ভারতীয় ভিসা নিয়েছেন ১ লাখ ৯০ হাজার মানুষ। এরমধ্যে চিকিৎসা ভিসা নিয়েছেন ৭০ হাজারেরও অধিক। ২০১৭ সালে চট্টগ্রাম থেকে ১ লাখ ৩৫ হাজার ৩’শ মানুষ ভারতীয় ভিসা নিয়েছেন। এরমধ্যে চিকিৎসা ভিসা নিয়েছেন ৫৫ হাজার রোগী। প্রতি বছর মেডিকেল ভিসার সংখ্যা বেড়েই চলেছে।

ভারত চিকিৎসা ফেরত রোগীর সাথে কথা বলে জানা যায়, বাংলাদেশি রোগীদের জন্য অধিকাংশ হাসপাতালে আলাদা পরিষেবা চালু করেছে। রোগীর রেজিস্ট্রেশন থেকে শুরু করে চিকিৎসা সংক্রান্ত বিষয়ে সহায়তা করছেন হাসপাতালের কর্মকর্তরা।
ভারতের মহারাষ্ট্র কর্ণাটকের বেঙ্গালুরুতে বিখ্যাত নারায়না ইন্সটিটিউট অব কার্ডিয়াক সায়েন্সে হাসপাতালে (ডা. দেবী শেঠীর হাসপাতাল নামে অধিক পরিচিতি) রোগীদের মধ্যে বেশির ভাগই বাংলাদেশের নাগরিক। প্রায় ৭০ শতাংশ রোগীই বাংলাদেশি। এরমধ্যে আবার ৫০-৬০ শতাংশ রোগী হচ্ছে চট্টগ্রামের। বাংলাদেশি রোগীদের রেজিস্ট্রেশন বা চিকিৎসা সংক্রান্ত বিষয়ে পরামর্শের জন্য আলাদা বুথ রাখা হয়েছে।

এখানে ভিসা থেকে শুরু করে চিকিৎসা সংক্রান্ত সব বিষয়ে বাংলা ভাষায় পরিষেবা দেওয়া হচ্ছে। হাসপাতালের চিকিৎসক থেকে শুরু করে নার্স-আয়াদের সবাই হিন্দি ও ইংরেজি ভাষায় কথা বলেন। আবার নিজের মধ্যে আঞ্চলিক ভাষা কর্ণাটকি ভাষায় কথা বলেন। তবে বাংলা ভাষাভাষিদের ভাষা সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের জন্য বাংলা পরিষেবা রাখা হয়েছে। চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা থেকে শুরু করে চিকিৎসাপত্র বুঝে নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার পরিষেবা রাখা হয়েছে।

ভারত থেকে চিকিৎসাসেবা নিয়ে আসা রোগী ও স্বজন মিলে অনেকের সঙ্গে কথা হয়। তাদের মতে, বিশ্বাস, ব্যবহার, আচরণ আর রোগের পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিয়ে অনেকটা সন্তুষ্ট। বিশেষ করে ডায়াগনস্টিক বিষয়ের প্রতি আস্থা বেশি রয়েছে। অনেকের অভিমত, চিকিৎসার নামে হয়রানির শিকার হতে হয়নি। একটি ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা একাধিকবার করানো হয় না। চিকিৎসকরা রোগীকে যথেষ্ট সময় দেন। রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে রোগের বিষয়ে খোলামেলা এবং দীর্ঘ সময় নিয়ে কথা বলেন। চিকিৎসা সংক্রান্ত খরচের বাংলাদেশের তুলনায় খরচও অনেকটা কম। এছাড়াও হাসপাতালগুলোতে ভর্তিকৃত রোগীদের সঙ্গে চিকিৎসক ও নার্সদের সুন্দর আচরণ করেন। এতেই রোগীরা স্বাচ্ছন্দবোধ করেন।

এসব কারণে চিকিৎসাব্যবস্থায় বাংলাদেশিদের কাছে ভারত-নির্ভরতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। ভারত সরকার ও সেখানকার হাসপাতালগুলো বাংলাদেশিদের জন্য নানা পরিষেবা চালু করেছে।

চট্টগ্রামে অবস্থিত হাইকমিশনারের ব্যক্তিগত সহকারী দিপুল বড়–য়া জানান, ভারতীয় ভিসা পেতে বাংলাদেশিদের এখন আর কোনো ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হয় না। চিকিৎসা সংক্রান্ত ডকুমেন্ট ঠিকঠাক থাকলে সহজেই ভিসা হয়ে যাচ্ছে। বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্র হওয়ায় বাংলাদেশি নাগরিকদের ভিসা দেওয়ার বিষয়ে খুবই আন্তরিক ভারত সরকার।

ভারতের বেঙ্গালুরু, ভেলোর, দিল্লী ও হায়দ্রাবাদে অনেকটা দালালমুক্ত পরিবেশে চিকিৎসা করানো যায়। তবে কলকাতায় দালালের খপ্পরে পড়ে হয়রানির শিকারের অভিযোগ রয়েছে। উন্নতমানের হাসপাতালের বদলে নামসর্বস্ব হাসপাতালে নিয়ে যান দালালচক্র।
ডায়াগনস্টিক সেন্টার বা ওষুধের দোকান : বাংলাদেশে একটি হাসপাতালকে ঘিরে গড়ে ওঠে অসংখ্য ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও বেসরকারি হাসপাতাল। এই ফাঁকে গড়ে ওঠে অনুমোদিত ডায়াগনস্টিক সেন্টারও।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকা দেখলেই বোঝা সেই চিত্র সহজেই অনুমেয়। কিন্তু উল্টো চিত্র দেখা গেছে ভারতে। কোনো নামি-দামী হাসপাতাল এলাকায় হাজার হাজার রোগীর সমাগম থাকলেও যত্রতত্র ডায়াগনস্টিক সেন্টার নেই। সম্প্রতি ভারতের বেঙ্গালুরুর বিখ্যাত হাসপাতাল নারায়না ইন্সটিটিউট অব কার্ডিয়াক সায়িন্সেস হাসপাতাল এলাকা ঘুরে আসা সাবেক এক কাউন্সিলর সাথে কলা বলা জানা যায়, হাসপাতাল এলাকায় কোনো ডায়াগনস্টিক নেই। সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা হাসপাতালগুলোর নিজস্ব ল্যাবেই করানো হয়। তবে ওষুধের দোকান রয়েছে। তাও বাংলাদেশের মতো সারি সারি নয়, হাতেগোনা কয়েকটি। দোকানগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ ইনজেকশন কয়েক ঘণ্টা নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় রাখার জন্য বিনামূল্যে আইসবক্স দেওয়া হয়।

একটি হাসপাতালকে ঘিরে দেড় শতাধিক আবাসিক হোটেল : বেঙ্গালুরু নারায়না হাসপাতালকে ঘিরে দেড় শতাধিক আবাসিক হোটেল-লজ গড়ে ওঠেছে। বাংলাদেশিদের টানতে প্রতিটি আবাসিক হোটেলে বাংলা ভাষাভাষির লোক রাখা হয়েছে। হোটেলগুলোতে রান্নাবান্নার সরজ্ঞামাদি রয়েছে। নিজেরাই রান্নাবান্না করে খাওয়ার সুযোগ রয়েছে। প্রতিটি হোটেলে নিজস্ব পরিবহনের ব্যবস্থা রয়েছে। সকাল থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত সময়ে হোটেল থেকে হাসপাতালে রোগী ও স্বজনদের আনা-নেওয়া হয়। এরজন্য আলাদা ভাড়া গুনতে হয় না। মান অনুযায়ী তিন শ রুপি থেকে হোটেলে কক্ষ পাওয়া যায়।

৫-৬ থেকে শুরু করে এক হাজার রুপির মধ্যে ভালোমানের হোটেল পাওয়া যায়। দুই কক্ষের এসব হোটেলে রান্নাবান্নার সুবিধা, ফ্রিজ-টিভিসহ থাকা-খাওয়ার সব ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়াও পথে-ঘাটে খাবার হোটেলগুলোতে বাংলাদেশিদের নজর কাড়তে বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সাইনবোর্ডে বাংলা বা বাঙালি খাবারের হোটেল লিখা হয়েছে।

গত সপ্তাহে ভারতের বেঙ্গালুরু থেকে মায়ের কিডনি রোগে চিকিৎসা করে দেশে ফিরেছেন পটিয়ার কোলাগাঁও এলাকা সাইফুল ইসলাম সর্দার। তিনি বলেন, হাসপাতাল এলাকা যেন এক মিনি বাংলাদেশ। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা ও স্থান থেকে হাজার হাজার মানুষ চিকিৎসার জন্য ছুটে যাচ্ছেন ভারতে। ঝক্কি-ঝামেলামুক্ত পরিবেশে চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করা যায়। হাসপাতাল ও আশপাশ এলাকায় শুধু বাংলাদেশিদের দেখা পাওয়া যায়। এছাড়াও মোড়ে মোড়ে কাঁচা সবজি, চাল, ডাল, তেল, ফলমূলের দোকান রয়েছে। সবমিলে নাগালের মধ্যে।

কথা হয় বোয়ালখালীর কানুনগোপাড়া মাস্টার বাজার এলাকার মৎস্যজীবী হারাধন দাসের সঙ্গে। তিনি বলেন, কোমরের ব্যথার জন্য চট্টগ্রামে অনেক নামকর ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়েছেন। চিকিৎসা নিয়েছেন। কিন্তু ব্যথা সারছে না। শেষতক ভারতের বেঙ্গালুরু ছুটে গেছেন। চট্টগ্রাম মহানগর জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব এয়াকুব হোসেন বলেন, তিনি চিকিৎসা নিয়েছেন এবং তার বয়োবৃদ্ধ এক আত্মীয় কিডনি রোগের জন্য চট্টগ্রামের অনেক নামী-দামী চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা নিয়েছেন। চিকিৎসার উন্নতি না দেখে ভারতে ছুটে যান। এরকম শত শত লোক চিকিৎসার জন্য ভারতে ছুটে যাচ্ছেন। বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা ভারতে চলে যাচ্ছে।

ভারতীয় হাই কমিশনার কার্যালয় সূত্র জানায়, গত ৫-৬ বছরের চিকিৎসার জন্য বেশি সংখ্যক বাংলাদেশি ভারতে যাচ্ছেন। এজন্য ভারত সরকার ভিসা পদ্ধতিও সহজ করে দিয়েছে। ভারতে চিকিৎসা নিতে যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে শুধু উচ্চবিত্ত নয়, মধ্য ও নি¤œবিত্ত লোকজনও ছুটে যাচ্ছেন। বাংলাদেশের একটি নামকরা হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে যে টাকা খরচ হয়, অনেকটা কাছাকাছি টাকায় ভারতের নামকরা একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে দেশে ফিরে আসা যায়।

সচেতন মহল মনে করেন, ভারত-সিঙ্গাপুরের মত বাংলাদেশেও উন্নত আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণ করলে প্রতিবছর একদিকে যেমন হাজার হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে অন্যদিকে দেশে চিকিৎসা সেবার মান বৃদ্ধি পাবে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী আফরোজা খানম সানি বাবার চিকিৎসা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আক্ষেপ করে বলেন, যে সরকার পদ্মা সেতু করতে পারে, সেই সরকার দেশে উন্নত মানের হাসপাতালও নির্মাণ করতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস।

Matched Content

দৈনিক সময় সংবাদ ২৪ ডট কম সংবাদের কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি,আলোকচত্রি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে র্পূব অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সর্ম্পূণ বেআইনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে কোন কমেন্সের জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।


Shares