| |

বান্দরবানে ১০ বছরে তামাক চাষ বেড়েছে ২০ গুন, কমেছে কৃষিজমি

প্রকাশিতঃ 11:59 pm | December 08, 2018

পটিয়া (চট্টগ্রাম) থেকে সেলিম চৌধুরী : বান্দরবান জেলা শহর এবং আলীকদমের পোয়ামহুরী থেকে লামা উপজেলা সদর পর্যন্ত সাংগু নদীর দুই তীরে তিন শতাধিক কিলোমিটার এলাকায় ব্যাপক আকারে এবারও তামাক চাষ শুরু হয়েছে। সড়কপথের দুইপাশে লামা উপজেলার ইয়াংসা থেকে ফাঁসিয়াখালী, আলীকদম উপজেলা সদর থেকে লামা উপজেলা সদরজুড়েই শুধু তামাক চাষ আর তামাক চাষের সূচনা নজরে পড়ছে আবারও। ফলে জেলার রুমা, থানছি, রোয়াংছড়ি, বান্দরবান সদর, আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি ও লামা উপজেলায় শীতকালীন শাকসবজীর আবাদ প্রতিবছরের মত এবারও ভয়ানকহারে কমে যাবে। বর্তমানে জেলা সদরসহ উপজেলা সদরগুলোতে সাধারণ তরকারীর দাম প্রতিকেজি গড়ে ৩০ থেকে ৬০ টাকা।

বান্দরবান পার্বত্য জেলায় সর্বনাশী তামাক চাষের ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। আসন্ন মৌসুম উপলক্ষে চাষীরা তামাক কোম্পানীগুলোর অগ্রীম অর্থসহায়তায় অবাধে তামাক চাষের জন্য মাঠে নেমেছে। জেলার নানাস্থানে বিপুল সংখ্যক তামাক পাতার বিজতলা স্থাপিত এবং চারা উত্তোলন করা হয়েছে। বহু এলাকায় ইতিমধ্যেই জমিতে চাষীরা তামাক চারা লাগিয়েছে।

গত ১০ বছরে জেলায় তামাক চাষের ক্ষেত্র প্রায় ২০ গুন বৃদ্ধি পেয়েছে, একইকারণে কমেছে কৃষিপণ্যের আবাদ। তবু প্রশাসন কিংবা সংশ্লিষ্টদের কোন মাথা ব্যথা নেই তামক চাষ প্রতিরোধে। ভোক্তা ও কৃষদের অভিযোগ, তামাকচাষ বিরোধী জোরালো কোন ভূমিকাও পালন করছেন না সরকারি কর্মকর্তারা।

জেলার থানছি উপজেলা সদর থেকে দুর্গম বড়মদক পর্যন্ত প্রায় ৪৮ কিলোমিটার নদী পথ। এর মধ্যে প্রায় ২৫ কিলোমিটারজুড়েই নদীর চরে তামাক চাষের জন্য জমি তৈরি করা হয়েছে। ব্যাপক এলাকায় তামাক বিজতলা স্থাপিত হয়েছে।

একইভাবে থানছি থেকে জেলা সদরের কাছে চাইংগা, তারাছা, বাগমারা, আন্তা পাড়া, জামছড়ি, বেতছড়া এবং জেলা শহরের ভাটিতে ভরাচর, লাংগিরচর থেকে চেমিমুখ পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার নদীর তীরে তামাক চাষের ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। এসব নদীর চরের মোট জমির প্রায় ৮০ ভাগই তামাকচাষের জন্য এবং বাকি ২০ ভাগ জমিতে কৃষিপণ্য আবাদের জন্য প্রস্তত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

একইভাবে রোয়াংছড়ি উপজেলা সদরের সমতল এলাকাসমুহেও তামাকচাষ করার জন্য জমি তৈরি করা হয়েছে। বেতছড়া ও তারাছামুখ এলাকায় ইতিমধ্যেই তামাক পাতার চারা রোপন করা হয়েছে, অন্যান্য এলাকায় তামাক চাষ শুরু হয়ে গেছে।

এদিকে জেলার থানছি উপজেলার বলিপাড়ায় প্রায় ৯০ ভাগ জমিতে এবারও তামাক চাষ শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। বলি বাজার এলাকার একশ্রেণীর মহাজন তামাকচাষীদের চড়াসুদে দাদন দিয়েছে। কয়েকজন তামাকচাষী (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) গত বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন, প্রতিহাজারে ৫০০ টাকাহারে সুদ নিয়েই বহু চাষী এবারও তামাকচাষ শুরু করে দিয়েছে। তামাক কোম্পানী গুলো তাদের সুবিধার জন্যে এবং পছন্দের চাষীদের মধ্যেই কেবল অগ্রীম লোন প্রদান করে থাকে। ফলে অন্যচাষীরা মহাজনের চড়াসুদেই তামাক চাষ করতে বাধ্য হচ্ছেন প্রতি বছরই।

বেশকটি এলাকা পরিদর্শন এবং কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, অবাধে তামাক চাষের ফলে এলাকা ভিত্তিক কৃষি জমি কমছে, বাড়ছে তামকা পাতা চাষের জমি। ফলে পুরো এলাকায় তরকারীর ও শাকসবজির আবাদ কমেছে। এতে হাটবাজারগুলোতে তরকারী ও সবজির সরবরাহ কমে যাওয়ায় এলাকাবাসীকে তিনগুন দামে শাকসবজি কিনে খেতে হচ্ছে। পুষ্টিবান সবজিরও কৃত্রিম সংকট বিরাজ করছে।

জেলা সদরে ৩০ থেকে ৬০ টাকা দামে প্রতিকেজি তরকারি কিনতে হচ্ছে ক্রেতাদের বর্তমানে। একইভাবে উপজেলা গুলোতেও সবজির চরম সংকট বিরাজ করছে। তবু নেই তামাক পাতার চাষ রোধে কোন পদক্ষেপ। তামাকচাষ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে, প্রতিরোধ করা হচ্ছে না।

বান্দরবান জেলা সদরের কৃষিবিদ আলতাফ হোসেন জানান, বান্দরবান জেলার পাহাড় ও সমতলের মাটি খুবই উর্বর এবং কৃষিপণ্য উৎপাদ উপযোগী। সর্বনাশী তামাকের বিকল্প চাষ হিসেবে আবাদ করতে আমাদের রাজস্ব খাত থেকে এ বছরে ২১০০, জন কৃষককে ১ ভিগা করে ভুট্টা বিজ, আমন ধান বিজ, বুরো ধান বিজ ও আউষ ধানের বিজ, ভিটি বেগুন বিজ প্রদান করা হয় ও সাথে বিনা মূল্যে বিভিন্ন সারও প্রদান করা হচ্ছে। শুধুমাত্র তামাক চাষ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আগামীতে আরো ৬০০ জন কৃষককে ঠিক এভাবে সরকারি রাজস্ব খাত হতে সহায়তা দেওয়া হবে।

এভাবে, তুলা, আখ, আদা-হলুদ, মসলা জাতীয়সহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য আবাদ করা অতিব প্রয়োজন। এতে পরিবেশ অনুকুলে থাকবে, মানুষের পুষ্টির যোগানও বজায় রাখা সম্ভব হবে।

বান্দরবান জেলা মৃত্তিকা বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, অবাধে তামাকচাষের ফলে পাহাড়ের মাটি ক্রমশ উর্বর শক্তি হারাচ্ছে। কৃষকদের এখনই সময় সেই সর্বনাশী তামাক চাষ থেকে ফিরে আসা। তামাক চাষের ফলে জমিতে কেঁচোসহ পরিবেশ রক্ষাকারী পোকা-মাকড়ও ধংস হয়ে যাচ্ছে। সরকারের কৃষি বিভাগসহ উন্নয়ন সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানগুলোকে তামাকের বিকল্প চাষে কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের দ্রুত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

জেলায় তামাকচাষে নিয়োজিত তামাক কোম্পানীগুলোর স্থানীয় কর্মকর্তারা বলেন, এলাকার চাষীরা নগদ অর্থ পাওয়ায় তামাকচাষের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। কোন চাষীকে অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে তামাকচাষ সম্প্রসারণ করা হচ্ছে না বলেও তারা দাবি করেন। তারা বলেন, দেশে তামাকচাষ বন্ধ হলে বিদেশ থেকে বছরে কমপক্ষে ৩০ হাজার কোটি টাকার তামাক আমদানী করতে হবে। তাছাড়াও তামাক উৎপাদনও বিক্রিত কারণে সরকার বতর্মানে প্রতিবছর কমপক্ষে ৮ হাজার কোটি টাকার নিশ্চিত রাজস্ব পাচ্ছে বলে তারা জানান।


দৈনিক সময় সংবাদ ২৪ ডট কম সংবাদের কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি,আলোকচত্রি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে র্পূব অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সর্ম্পূণ বেআইনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে কোন কমেন্সের জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।


Shares
error: Content is protected !!