| |

আজ ১০ নভেম্বর স্বৈরাচার বিরোধি আন্দোলনের কিংবদন্তি মঠবাড়িয়ার কৃতি সন্তান শহীদ নূর হোসেন দিবস

বাংলাদেশের জনপ্রিয় ও সর্বশেষ খবর পেতে আ্যপসটি ইনস্টল করুন

প্রকাশিতঃ 2:22 pm | November 10, 2018

ফয়সাল আজম অপু , বিশেষ প্রতিনিধিঃ “স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক” এ স্লোগান বুকে ও পিঠে ধারণ করে তৎকালীন স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে (১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর) শহীদ হয়েছিলেন অকুতোভয় সংগ্রামী নূর হোসেন । সেই থেকে গণতন্ত্রের কিংবদন্তি  স্বরণে প্রতি বছর ১০ নভেম্বর শহীদ নূর হোসেন দিবস পালিত হয়।

নূর হোসেনের পৈতৃক নিবাস পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলার সাপলেজা ইউনিয়নের ঝাটিবুনিয়া গ্রামে। তাঁর বাবার নাম মজিবুর রহমান ওরফে কাঞ্চন মিয়া আর মায়ের নাম মরিয়ম বেগম। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে তিনি তৃতীয়। নূর হোসেনের জন্ম ১৯৬৪ সালে ঢাকার নারিন্দায়। নূর হোসেনের মজিবুর রহমান ঢাকায় আসেন ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি। এরপর থেকে ষাট ও সত্তরের দশকে তিনি সব রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন।

যদিও দারিদ্র্য ছিলো নূর হোসেনের পরিবারের নিত্যদিনের সঙ্গী, তবু তিনি চেয়েছিলেন লেখাপড়া শিখতে। যার ফলে তাঁকে ভর্তি করা হয় বাড়ির পাশের রাধা সুন্দরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। জ্ঞানপিপাসু নূর হোসেন পঞ্চম শ্রেণি পাস করার পর ভর্তি হন গ্র্যাজুয়েট হাই স্কুলে। অভাবের তাড়নায় বেশি দূর পড়ালেখা করতে পারেননি। অষ্টম শ্রেণি শেষ করার পর পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে মোটর মেকানিকের কাজে যোগ দিতে হয়েছিলো। পেশা হিসেবে তিনি মিনিবাস সমিতি চালিত বাসের সুপারভাইজার হিসেবেও দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। কাজের ফাঁকে নূর হোসেন নিজ উদ্যোগে সদরঘাটের কলেজিয়েট নৈশ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। আস্তে আস্তে রাজনীতিতে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। তখন থেকেই বিভিন্ন মিটিং মিছিলে যোগদান করতেন। নেতৃত্ব দিতেন।

১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ঢাকা মহানগরী অবরোধ ও ঘেরাও কর্মসূচি ঘোষণা করে। এর বিপরীতে সরকারের পক্ষ থেকে ৯ নভেম্বর সকাল ৬টা থেকে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত সাতদিনের জন্য পাঁচ বা ততোধিক ব্যক্তির সমাবেশ, মিছিল, বিক্ষোভ প্রদর্শন ও সকল প্রকার অস্ত্র-শস্ত্র, বিস্ফোরক দ্রব্য, লাঠিসোটা বহন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। আর এ আদেশ বলবৎ করার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী নিয়োগ করা হয়।

যে স্লোগান বুকে-পিঠে লিখে গণতন্ত্রের আন্দোলনে জীবন্ত পোস্টার হয়ে ইতিহাস হয়ে আছেন, সেই স্লোগান নূরের গায়ে সাদা রঙ দিয়ে লিখে দিয়েছিলেন তারই বন্ধু মো. ইকরাম হোসেন। লেখার সময় নূর হোসেনকে বলেছিলেন, “এভাবে বুকে-পিঠে লিখলে পুলিশ যদি তোকে গুলি করে?” প্রতি উত্তরে নূর বলেছিলেন, “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশের জন্য প্রায় সারা জীবন জেল খেটেছেন, অনেক কষ্ট সহ্য করেছেন। আমি কেন পারবো না! আমি গণতন্ত্রের জন্য শহীদ হতে প্রস্তুত।”

ঐদিন সকাল ৯টা পর্যন্ত ঢাকা মহানগরীর সর্বত্র জীবনযাত্রা ছিলো মোটামুটি স্বাভাবিক। সকাল ৯টার দিকে তোপখানা রোড পুলিশ বক্সের অদূরে সিপিপি অফিসের সামনে কিছু লোক জমায়েত হলে পুলিশ সেখান থেকে প্রায় ২০ জনকে আটক করে। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে থেকে প্রায় দু’শ লোকের মিছিল শুরু হয়ে পুলিশ বক্সের দিকে এগুতে থাকে। এ সময় পুলিশ হাউজ বিল্ডিং ফিন্যান্স কর্পোরেশন ভবনের সামনে লাঠিচার্জ করে। এরপর থেকে মিছিলে লোক সংখ্যা বাড়তে থাকে। তোপখানা রোডের পুলিশ বক্স থেকে গোলাপ শাহ মাজার পর্যন্ত লোক জমায়েত হতে থাকে।

স্বৈরাচারী সরকার পতনের জন্য সংগঠিত সুবিশাল মিছিলের প্রধান ফোকাস ছিলেন একজন সাধারণ বেবিট্যাক্সি চালকের ছেলে বাংলার ইতিহাসের এক অদম্য সাহসী বীর কালো বর্ণের, লম্বা টগবগে যুবক নূর হোসেন। সেদিন তার চোখেমুখে যেন ছিলো আগুনের ফুলকি। বুকে-পিঠে লেখা ছিল স্বাধীন বাংলার জনগণের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি।

পায়ে কেডস জুতা, পরনে জিন্সপ্যান্ট, কোমড়ে বাঁধা শার্ট, উদোম গতর, বুকে পিঠে লেখা অমর বাণী। সত্যিই জনতার মাঝে সেদিন এক অন্য রকম মুখ ছিলেন তিনি। সকলের চোখে পড়েছিলো তা। ফাঁকি দিতে পারেননি স্বৈরশাসকের লেলিয়ে দেয়া পুলিশ বাহিনীর চোখকেও। মিছিলটি যখন গুলিস্তান জিরো পয়েন্টের কাছাকাছি পৌঁছায়, ঠিক তখনই শুরু হয় মিছিলের উপর পুলিশের গুলিবর্ষণ। একটি গুলি এসে ছিদ্র করে দেয় নূর হোসেনের বুক।

বায়তুল মোকাররমের মূল গেটের কাছে মুহূর্তের মধ্যে লুটিয়ে পড়েন নূর হোসেন। মরণ যন্ত্রণায় ছটফট করা নূর হোসেনকে সুমন নামে এক যুবক রিকশায় করে হাসপাতালের দিকে যান। গুলিস্তানের গোলাপ শাহ মাজারের কাছে পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়ায় স্বৈরাচারীর পুলিশ বাহিনী। তাদের কয়েকটি গাড়ি এসে রিকশাটিকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে। গুলিবিদ্ধ নূর হোসেনকে টেনে হিঁচড়ে রিকশা থেকে নামিয়ে পুলিশ গাড়িতে তুলে নেয়। একজন নিষ্ঠুর পুলিশ সদস্য পায়ের বুট দিয়ে তাঁর বুকে চেপে ধরে। এরপর নূর হোসেনকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরে সম্ভবত বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে নিতে বাধ্য হন বাংলার এই সাহসী বীর সন্তান।

শহীদ নূর হোসেনের আত্মত্যাগ বাংলাদেশের নেতাকর্মী, লেখক, কবি-সাহিত্যিক, সাংবাদিকসহ নানা শ্রেণির মানুষকে আলোড়িত করেছিলো দারুণভাবে। তাঁকে নিয়ে লেখা হয় বহু কবিতা, গল্প, গান আর নাটকও। বুকে ও পিঠে লেখা স্লোগানটি সারাদেশের জনতার স্লোগানে পরিণত হয়। এ সংগ্রামের ধারাতেই ১৯৯০ সালের ৪ ডিসেম্বর স্বৈরাচারী শাসক পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এর মধ্যে দিয়ে স্বৈরাচার সরকারের পতন ঘটে। দেশে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় গণতন্ত্র।

নূর হোসেন সহ অসংখ্য শহীদের আত্মত্যাগের পথ বেয়ে স্বৈরাচারের পতন করে দেশে ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা পায়। আন্দোলনের জোয়ারে নব্বইয়ের শেষ দিকে ভেসে যায় স্বৈরাচারের তক্তপোশ। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে নূর হোসেনের শহীদী আত্মদান আন্দোলনকারীদের প্রাণে বিপুল শক্তি ও সাহস জুগিয়েছিল। শহীদ নূর হোসেন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠেন। এরপর থেকে প্রতিবছর যথাযোগ্য মর্যাদায় ১০ নভেম্বর শহীদ নূর হোসেন দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। নূর হোসেনের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তার নামে স্মারক ডাকটিকেট প্রকাশ করা হয়েছে। ঢাকার জিরো পয়েন্টের নাম রাখা হয়েছে নূর হোসেন স্কয়ার।
আজ শনিবার ১০ নভেম্বর  সকালে ফুলে ফুলে ভরে উঠেছে সেই স্থান। হয়েছে হাজারো মানুষের সমাগম। রাজনীতিবীদ, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক সহ সকল মানুষের পদচারনায় মুখরিত হবে পুরো নূর হোসেন স্কয়ার হলেন এলাকা। কিন্তু মঠবাড়িয়ায় নূর হোসেনের জন্মভিটায়  দিবসের কোনো অনুষ্ঠান পালন করা হবে কি? মঠবাড়িয়ার সকল সচেতন মানুষ, সামাজিক সংগঠন এবং বিশেষ করে সকল রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীদের কাছে আমাদের অনুরোধ রইলো আজ শনিবার (১০ নভেম্বর) যেন সারা দেশের মতো মঠবাড়িয়াতেও শহীদ নূর হোসেন দিবস পালন করা হয়। আমাদের সন্তানকে যদি আমরাই স্মরন না করি তাহলে অন্যরা কতদিন করবে?

দৈনিক সময় সংবাদ ২৪ ডট কম সংবাদের কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি,আলোকচত্রি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে র্পূব অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সর্ম্পূণ বেআইনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে কোন কমেন্সের জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।


Shares
error: Content is protected !!