| |

সাকা পরিবার কোণঠাসা

বাংলাদেশের জনপ্রিয় ও সর্বশেষ খবর পেতে আ্যপসটি ইনস্টল করুন

প্রকাশিতঃ 10:48 am | October 20, 2018

গভীর সংকট অতিক্রম করছে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসি হওয়া চট্টগ্রামের সাবেক বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর পরিবার। সাকা না থাকায় এলাকার রাজনীতিতে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে পরিবারটি। তার অনুসারী নেতাকর্মীরা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে ক্রমান্বয়ে দূরে সরে যাচ্ছেন। মূলত দলে বিভক্তি ও ইমেজ সংকটের কারণেই বেকায়দায় পড়েছে পরিবারটি।

আগামী নির্বাচনে চট্টগ্রামের তিনটি আসন তথা চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি), চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) ও চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) থেকে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী সাকা পরিবারের তিন সদস্য। তবে এসব আসনে তাদের অবস্থান ভালো নয়। অনেক দিন ধরে দেশেও নেই এই পরিবারের সদস্যরা। আবার দলে বিকল্প প্রার্থী তৈরি হওয়ায় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন তারা। ফলে শেষ পর্যন্ত তারা মনোনয়ন পেলেও দলীয় নেতাকর্মীদের পাশে পাবেন কি-না তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। আর এসব কারণে নির্বাচন সামনে রেখে পরিবারটিকে নিয়ে আশা-নিরাশার দোলাচলে বিএনপি নেতাকর্মীরা।

সাকা চৌধুরীর বড় ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী রাঙ্গুনিয়া, সাকার স্ত্রী ফরহাত কাদের চৌধুরী ফটিকছড়ি ও ছোট ভাই গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী রাউজান থেকে নির্বাচন করতে আগ্রহী বলে জানিয়েছেন ওই পরিবারের ঘনিষ্ঠ বিএনপি নেতাকর্মীরা। তবে তারা দেশে নেই। হুম্মাম কাদের চৌধুরী এখন সিঙ্গাপুরে, সাকার আরেক ছেলে ফায়েজ কাদের চৌধুরী লন্ডনে, মেয়ে ফারজিন কাদের চৌধুরী কানাডায় এবং স্ত্রী ফরহাত কাদের চৌধুরী ঘুরেফিরে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে বিদেশে থাকছেন বলে জানিয়েছেন রাঙ্গুনিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি শওকত আলী নূর।

সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী জাতীয় পার্টি, এনডিপি ও বিএনপির টিকিটে রাঙ্গুনিয়া, রাউজান ও ফটিকছড়ি আসন থেকে ছয় দফায় নির্বাচন করে জয়লাভ করেন। সর্বশেষ ২০০৮ সালের নির্বাচনে ফটিকছড়ি আসনে জয়লাভ করলেও রাঙ্গুনিয়ায় পরাজিত হন। এই তিনটি এলাকাতেই তার জনপ্রিয়তা ছিল। তবে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ২০১৫ সালের নভেম্বরে তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পর থেকে পরিবারটি গভীর ইমেজ সংকটে পড়ে। একে একে দূরে সরে যেতে থাকেন তার অনুসারী বিএনপি নেতাকর্মীরা।

চট্টগ্রামে সাকা পরিবারের সবচেয়ে কাছের মানুষ ছিলেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক লায়ন আসলাম চৌধুরী। রাষ্ট্রদ্রোহসহ বিভিন্ন মামলায় তিনি এখন কারাগারে। আরেকজন কাছের মানুষ নগর বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এরশাদ উল্লাও কাছে নেই। আরও অনেকে দূরে সরে গেছেন।

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, রাঙ্গুনিয়া আসনে বিএনপির একেবারে বাজে অবস্থা।

আসনটি থেকে হুম্মাম চৌধুরী কিংবা ফরহাত কাদের নির্বাচন করতে আগ্রহী। বিভিন্ন সময়ে তারা তাদের এই আগ্রহের কথা প্রকাশও করেন। কিন্তু এলাকার বিএনপি নেতাকর্মীরা স্পষ্টত দুই ভাগে বিভক্ত। একটি পক্ষ ‘বহিরাগত’ প্রার্থীর বিরোধিতা করছে। কারণ সাকার বাড়ি রাউজানের গহিরা গ্রামে। তাই তারা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্য থেকে প্রার্থী চান। এখানে বিএনপি থেকে নির্বাচন করতে চান সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আবু আহমেদ হাসনাত, উপজেলা বিএনপির সভাপতি কুতুব উদ্দিন বাহার, সাধারণ সম্পাদক শওকত আলী নূর ও জিয়া স্মৃতি পরিষদ চট্টগ্রাম উত্তর জেলা কমিটির আহ্বায়ক রোটারিয়ান জসিম উদ্দিন চৌধুরী।

২০১৪ সালের নির্বাচনে রাঙ্গুনিয়া থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ। ২০০৮ সালের নির্বাচনেও হেভিওয়েট প্রার্থী সাকা চৌধুরীকে হারিয়ে বিজয় লাভ করেন তিনি। তবে এর আগে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে বিএনপি থেকে রাঙ্গুনিয়ায় এমপি নির্বাচিত হন সাকা চৌধুরী। ১৯৯১ সালে মোহাম্মদ ইউসুফ (কমিউনিস্ট পার্টি) ১৫ দলীয় জোট থেকে এমপি হন। তারও আগে ১৯৮৮ সালে এ আসনে জাতীয় পার্টি থেকে এমপি নির্বাচিত হন মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম। ১৯৮৬ সালে সাকার ভাই গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী জাতীয় পার্টির টিকিটে এমপি হয়েছিলেন এ আসনে।

এ আসন থেকে দলীয় মনোনয়ন চাইছেন রাঙ্গুনিয়ার বিএনপি নেতা ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আবু আহমেদ হাসনাত। তিনি সাকার অনুসারী ছিলেন। হাসনাত সমকালকে বলেন, ‘সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী পরিবারের প্রতি বিএনপি চেয়ারপারসনসহ দলের হাইকমান্ডের বিশেষ সহানুভূতি রয়েছে। কিন্তু তারা মাঠে নেই। প্রতিকূল পরিবেশে তাদের কেউ রাঙ্গুনিয়া আসন থেকে আদৌ নির্বাচন করবেন কি-না তা পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। আমরা যারা দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী তাদের প্রস্তুত থাকতে বলেছেন দলের হাইকমান্ড। এ জন্য আমিও নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়েছি।’

নিজেদের কোণঠাসা অবস্থার চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে সাকা অনুসারী রাঙ্গুনিয়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শওকত আলী নূর সমকালকে বলেন, ‘রাঙ্গুনিয়ায় আমাদের বিরুদ্ধে রেড অ্যালার্ট জারি করে রাখা হয়েছে। আমরা এলাকাছাড়া। মাঝে মধ্যে জানাজা, বিয়ের মতো অনুষ্ঠানে গেলেও দ্রুত চলে আসতে হয়। না হলে দেখা যায় পুলিশ হাজির হয়।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আমাদের কথাবার্তা হয়। তবে সেটা খুব কম। তারা অনেক দিন ধরে দেশের বাইরে রয়েছেন। এখানে তাদের পরিবারের কাউকে দল থেকে মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে। তারা নির্বাচন না করলে তাদের পরামর্শ নিয়ে মনোনয়ন দেওয়া হবে।’

রাঙ্গুনিয়ার মতো নিজ এলাকা রাউজানেও সাকা পরিবার দাঁড়াতে পারছে না। এখানে দলটির তেমন কোনো কার্যক্রম নেই বললেই চলে। এলাকার আওয়ামী লীগ দলীয় বর্তমান সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর দাপটে অসহায় বিএনপি নেতাকর্মীরা। মাঠেই নামতে পারছে না তারা। অনেকেই এলাকাছাড়া। আসনটি থেকে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী সাকা চৌধুরীর ছোট ভাই বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াস কাদের চৌধুরীকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন বিএনপি চেয়াপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক এমপি গোলাম আকবর খোন্দকার। এই দুই বিএনপি নেতার নেতৃত্বে দলটির স্থানীয় নেতাকর্মীরা দুই ভাগে বিভক্ত। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হন গিয়াস কাদের। একই বছর বিতর্কিত আরেকটি নির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হন গোলাম আকবর খোন্দকার। রাউজানে ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন বর্তমান এমপি ফজলে করিম চৌধুরী। তবে এর আগে ২০০৮ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীকে পরাজিত করে এমপি নির্বাচিত হন তিনি।

ফটিকছড়ি আসনে ফরহাত কাদের চৌধুরী নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী। তবে সাকা চৌধুরীর অবর্তমানে এখানে ভালো অবস্থান গড়ে তুলেছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ-তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক ও সাংবাদিক নেতা কাদের গনি চৌধুরী। উপজেলার দমদমা গ্রামের বাসিন্দা গণি উপমহাদেশের অন্যতম কামেল অলি হজরত শাহ সুফি সৈয়দ আবদুল গনি চৌধুরীর দৌহিত্র। জাতীয় প্রেসক্লাবে কাদের গনি দু’বার যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। বর্তমানে তিনি ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের সভাপতি। বিএনপিতে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে আরও রয়েছেন উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও বিএনপিপন্থি পেশাজীবী পরিষদের সদস্য সচিব ডা. খুরশিদ জামিল চৌধুরী এবং সাবেক বিচারপতি ফয়সাল মাহমুদ ফয়েজীসহ আরও কয়েকজন। তাদের নেতৃত্বে বিভক্ত স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আসনটি থেকে সংসদ এমপি হয়েছিলেন সাকা চৌধুরী। বর্তমানে এখানকার এমপি ১৪ দলীয় জোটের শরিক তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী।

কাদের গনি চৌধুরী সমকালকে বলেন, ‘দল যদি আমাকে মনোনয়ন দেয়, তাহলে আমি নির্বাচন করব। অন্য কাউকে মনোনয়ন দিলেও সর্বতোভাবে সমর্থন দিয়ে কাজ করব। সন্ত্রাসের জনপদ ফটিকছড়িতে শান্তি ফিরিয়ে আনতে বিএনপির বিজয়ের বিকল্প নেই।’


দৈনিক সময় সংবাদ ২৪ ডট কম সংবাদের কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি,আলোকচত্রি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে র্পূব অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সর্ম্পূণ বেআইনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে কোন কমেন্সের জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।


Shares
error: Content is protected !!