| |

মীরসরাই ট্র্যাজেডি’র ৭ম বার্ষিকী, মীরসরাইবাসী এখনো কাঁদে

প্রকাশিতঃ 2:53 pm | July 12, 2018

সানোয়ারুল ইসলাম রনি, মীরসরাই প্রতিনিধি : জুলাই মাস, আমাদের জাতীয় জীবনে এই মাসের কোনো গুরুত্ব না থাকলেও, এদেশেরই একটি উপজেলা মীরসরাই বাসীর জন্য একটি শোকের মাস। সমগ্র দেশের মানুষ শোক ভুলে গেলেও প্রতি বছর জুলাই মাসের আগমনে অন্তত মীরসরাই বাসীরা এখনো কাঁদে। বরাবরের মতোই ২০১৮ সালের জুলাই মাসও আমাদের জন্য বয়ে নিয়ে এসেছে শোক বার্তা। জুলাই মাস এসে আমাদেরকে স্মরন করিয়ে দেয় সন্তান হারানোর শোক।

জুলাই মাস এসে বারবার আমাদের মনে করিয়ে দেয় ভাই হারানোর জ্বালা। এই মাস আসলে শুরু হয়ে যায় মীরসরাই বাসীর শোকের অগ্নেয় গিরিতে অগ্ন্যুৎপাত। সাল ২০১১ ইং, জুলাই মাসের প্রথমার্ধে একটি আকস্মিক বয়াবহ দুর্ঘটনার মাধ্যমে মীরসরাই উপজেলার ৯টি গ্রামের ৪৫টি পরিবারে নেমে আসে শোকের কালো ছায়া।

দুর্ঘটনাটি এতোই হৃদয় বিধারক ছিলো যে সেদিন যেনো মীরসরাই উপজেলার উপর দিয়ে একটি ঘূর্ণিঝড় বয়ে গিয়েছিল। আর যেনো ৪৫টি পরিবারের সব স্বপ্ন ভেঙ্গে এক নিমিষে তছ্নছ করে দিয়ে গেলো। প্রতিটি পরিবার সন্তান হারিয়ে আজও কাটিয়ে উঠতে পারিনি শোকের দকল। এখনো নিহদের স্বজনদের বুকের উপর শোক যেনো জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে আছে। যারা সেদিন যেকোনো ভাবে বেঁচে গিয়েছিল তাঁরা এখনো সে দুর্ঘটনার স্মৃতি মনে হলে দিন-দুপুরে ভয়ে আঁতকে উঠে। ভয়ে হাতপা সব যেনো ঠান্ডা হয়ে আসে। তাঁরা প্রাণে বেঁচে গেলেও, কেউ কেউ মানসিক ভাবে অনেকটা অসুস্থ্য। হয়তো কেউ কেউ পঙ্গুত্ব বরণ করে পরিবারের বোঝা হয়ে বসে আছে। আজো তাঁরা স্বাভাবিক হতে পারছে না। সেদিনের এই দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে অনেকে অনেক কিছুই বলে থাকে।

কেউ বলে চালক মোবাইলে কথা বলছিলো, কেউ বলে সে প্রকৃতপক্ষে চালক ছিলোনা, সে ছিলো হেল্পার। এসব কথা বলে আমরা আমাদের আসল দ্বায়িত্ব বোধের কথা ভুলে যাই। যে যাই বলুক, সোজা কথা হলো দেশের প্রচলিত আইন কানুনের শীতিলতাই এই বয়াবহ দুর্ঘটনার মূল কারণ। হতে পারে আইনের শীথিলতা, আইনের অপব্যবহার কিংবা রয়েছে আইনের ফাঁক। অতঃপর একজন চালকের বেপরোয়া মনোভাব। যার ফলে একটি গ্রাম্য সড়কে দুর্ঘটনায় ৪৫টি ফুটফুটে তাজা ফুলের মতো স্কুল ছাত্রের অকালে সমাধি রচিত হলো। আজ আট বছর পর গোটা জাতীর কাছে এই মাসটি স্মরনীয় হয়ে না থাকলেও অন্তত মীরসরাই বাসী ভুলে যেতে পারে না। যে পিতা নিজের সন্তানের লাশ কাঁধে চেপেছে, যে ভাই ভাইয়ের লাশ কাঁধে চেপে কবরস্থানে নিয়ে গেছে, তাদের কাছে এই মাসটিকে ভুলে যাওয়া মোটেও সম্ভব নয়।

যে মা তাঁর নাড়ি ছেঁড়া অর্জন, আদরের সন্তানকে অকালে চির বিদায় জানিয়েছে তাঁর পক্ষে তো ভুলে যাওয়া মোটেই সম্ভব নয়। যে খেলার সাথীরা তাঁদের ৪৫ জন বন্ধুর লাশের মিছিলের সামনে জানাজার নামাজ পড়ে শেষ বিদায় জানিয়েছে তাঁরা কি আজ পর্যন্ত এই জুলাই মাসটিকে ভুলে যেতে পেরেছে? নিশ্চয় না। এমন একটি চরম দুঃস্বপ্নের দিন একজন মানুষ আমৃত্যু ভুলতে পারেনা। এটা কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। আর যে কয়জন এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা থেকে প্রাণে বেঁচে গিয়েছিল, বাকী জীবনের প্রতিটি মাসই যেনো তাঁদের কাছে জুলাই মাস, প্রতিটি দিনই যেনো ১১ ই জুলাই।

মীরসরাই বাসীর দুঃস্বপ্নের দিনটি ছিল ২০১১ সালের ১১ই জুলাই। উপজেলা পর্যায়ে মাধ্যমিক স্কুলের ছাত্রদের মধ্যে ফুটবল টুর্নামেন্ট চলছিল। মীরসরাই স্টেডিয়ামে খেলা দেখে প্রায় ৬৫জন ছাত্র আনন্দোৎফুল্ল অবস্থায় একটি ট্রাকে চেপে বাড়ি ফেরার সময় বড়তাকিয়া-আবু তোরাব সড়কের প্রায় মাঝামাঝি স্থানে একটি ছোট ব্রিজের পাশে পানিতে পরিপূর্ণ খাদে ট্রাকটি প্রায় সব যাত্রী নিয়ে উল্টে পড়ে যায়। আর এমতাবস্থায় সব চালকেরা যা করে চালক মফিজ ও তাঁর হেল্পার বরাবর সেটাই করেছে। তাঁরা দুজন ৬৫ জন যাত্রীকে ট্রাকের নিচে ডুবন্ত অবস্থায় ফেলে রেখে পালিয়ে যায়।

অতঃপর প্রথমে স্থানীয় অধিবাসীরা ছাত্র এবং অন্যান্য যারা ছিলো তাদের উদ্ধার করতে এগিয়ে আসে। তারপর প্রসাশনের তৎপরতায় উদ্ধার কাজ আরো বেগবান করা হয়। ততোক্ষণে প্রায় চল্লিশ জন ছাত্রের মৃত্যু ঘটে। কয়েক জন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসারত অবস্থায়ও মৃত্যু বরণ করেন। সেদিন একটি সড়ক দুর্ঘটনা প্রত্যক্ষ্য করে গোটা জাতি বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল। শুধু মীরসরাই উপজেলা বাসীর মধ্যে নয়, এই দুর্ঘটনায় সমগ্র দেশের সব বিদ্যালয় গুলোতে শোকের ছায়া নেমে এসেছিল।

স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি মাত্র দুর্ঘটনায় একত্রে ৪৫ জন স্কুল ছাত্রের মৃত্যুর ঘটনা এটাই প্রথম। শুধু মীরসরাই বাসীর কাছে নয়, সমগ্র বাংলাদেশে এই দুর্ঘটনা “মীরসরাই ট্র্যাজেডি” নামে খ্যাত। আমি দেশের বিভিন্ন জেলার মানুষের সাথে বিভিন্ন সময় পরিচিত হতে যেয়ে দেখেছি, অনেকে আমাকে প্রশ্ন করেছে “আপনি তাহলে সেই মীরসরাইয়ের মানুষ যেখানে একত্রে ৪৫ জন ছাত্র খাদে ট্রাক উল্টে মৃত্যু বরণ করেছিল”।

তখন আমি আরো পরিস্কার বুঝতে পারলাম এই দুর্ঘটনা সমগ্র দেশের মানুষকে কতটা নাড়া দিয়েছিলো। আজও জুলাই মাসের আগমনী ধ্বনি দেশের যেকোনো সচেতন মানুষের বিবেকে নাড়া দেয়। প্রতি বছর জুলাই মাস আসে আর সন্তান হারানো স্বজনদের অশ্রু ধারা বারবার প্রবাহিত হয়। বুকের মধ্যে পাথর চাপা দিয়ে রাখা শোকের মাতম বারবার উচ্চারিত হয়।

বুকের আধা কাঁচা ক্ষতটি আবারো নতুন রূপে ব্যাথা ছড়িয়ে স্বজনদের বারবার কাতর করে দিয়ে যায়। সহপাটি হারানো বন্ধুদের বুকের গভীরে রক্ত ক্ষরণ হয়। প্রাণোচ্ছল এসব ছাত্রদের যেসব শিক্ষকরা পাঠদান করেছেন তাঁদের বিবেকও নিশ্চয় আজও আন্দোলিত হয়।
তৎকালীন সময়ের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে যেটা জেনেছি, চালক মফিজ এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে ট্রাক চালাচ্ছিলো আর অন্য এক হাতে মোবাইলে আলাপ করছিলো। অতঃপর এক নিমিষে ট্রাকটি উল্টে খাদে পড়ে গেলো।

চতুর মফিজ ও তাঁর সহকারী ঠিকই নিজের প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়েছিলো। কিন্তু একজন চালকের বেপরোয়া আচরণের বলিদান হয়ে অকালে ঝরে গেলো সম্ভাবনাময় ৪৫টি তরতাজা প্রাণ। প্রতিটি সন্তানকে নিয়ে প্রতিটি পরিবারের অনেক স্বপ্ন থাকে। সেদিন একজন বখাটেতুল্য মফিজের ঔধ্যত্বপনায় শুধু ৪৫ জন ছাত্রের মৃত্যু হয়নি, ৪৫টি পরিবারের হাজারো স্বপ্নেরও কবর রচনা হয়েছে। প্রতিনিয়ত এদেশে প্রতিদিন কতজন মানুষ অকাল মৃত্যু বরণ করছে আমরা শুধু হিসেবেই কষে যাচ্ছি। কিন্তু মফিজেরা বহাল তবিয়তে রয়ে যাচ্ছে। আমরা যাঁরা মানুষ রূপী যাত্রী, তাঁরা প্রায়ই চালক মফিজদের গাড়ী চালানোর খেলার পুতুল। যতটুকু কাছে থেকে দেখেছি, তাঁদের কাছে গাড়ী চালানোটা খেলা আর রাস্তার পথচারী কিংবা তাঁদের পিছনে বসে থাকা মানুষ গুলো তাঁদের খেলার পুতুল।

মফিজ পাঁচ বছর জেল খেটে ঠিকই তাঁর আপনজনদের কাছে ফিরে এসে বহাল তবিয়তে আছে। কিন্তু আমরা সবাই জানি, মীরসরাইয়ের ৯টি গ্রামের ৪৫ জন সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থী আর কখনো আমাদের কাছে ফিরে আসবে না। এটা যে কতো বড়ো একটা অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেলো তা অন্য কেউ না বুঝলেও সেসব শিক্ষার্থীদের পিতামাতারা হাঁড়ে হাঁড়ে বুঝেন।

জানি আমরা যাঁরা দুনিয়াতে এখনো বেঁচে আছি, তোমাদের প্রতি অন্যায়ের সঠিক বিচার করতে পারিনি। তাই বলে তোমরা কষ্ট পেয়োনা। মফিজদের অন্যায়ের সঠিক বিচার এপারে না হলেও বিশ্বাস করি পরকালে হবে। সেদিন তোমরাও দেখবে। মীরসরায়ের প্রিয় সন্তানেরা তোমরা মনে রেখো, আমরা তোমাদের ভুলিনি, ভুলবোও না। দোয়া করি তোমরা যেনো পরপারে ভালো থেকো।


দৈনিক সময় সংবাদ ২৪ ডট কম সংবাদের কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি,আলোকচত্রি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে র্পূব অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সর্ম্পূণ বেআইনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে কোন কমেন্সের জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।


Shares
error: Content is protected !!