| |

চাঁপাইনবাবগঞ্জে আম ব্যবসায়ীরা আম নিয়ে বিপাকে ক্রেতা শূন্য বাজার

প্রকাশিতঃ 10:05 pm | July 05, 2018

ফয়সাল আজম অপু , চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে : সুমিষ্ট আমের রাজধানী খ্যাত জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জে গত ২০ বছরের মধ্যে এবছর সবচেয়ে কমদামে আম বিক্রি হচ্ছে। ক্রেতা না থাকায় পানির দরে আম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন আমচাষী ও ব্যবসায়ীরা।
চাষীরা জানান, স্মরণকালের মধ্যে দাম নিয়ে এমন বিপর্যয় আর কখনো দেখা যায়নি।

গত বছরের চেয়ে অর্ধেকেরও কম দাম আম বিক্রি হওয়ায় ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছেন শতশত আমচাষী ও ব্যবসায়ী। ফলে পুঁজি হারিয়ে দিশেহারা আমের রাজধানীর আম ব্যবসায়ীরা। এই বিপর্যয়ের কারণে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ব্যবসায়ীদের প্রায় ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন আম ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ ম্যাংগো প্রডিওসার মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন। এই অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা দেওয়ারও দাবী জানিয়েছে সংগঠনটি।

সড়কের দু’ধারে সারি সারি আম বাগান ও সুস্বাদু আমের কথা উঠলেই সবার আগে চলে আসে সীমান্তবর্তী জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাম। জেলায় এবার প্রায় ২৯ হাজার ৫১০ হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়েছে। আমগাছের পরিমান প্রায় ২২ লাখ। চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি অফিস জানায়, জেলায় প্রায় আড়াইশ জাতের আম চাষ হয়। এরমধ্যে খিরসাপাত (হিমসাগর), ক্ষুদি খিরসা, ল্যাংড়া, বোম্বাই, গোপালভোগ, ফজলী, আম্রপালি, আশ্বিনা, বৃন্দাবনী, লক্ষনভোগ, কালীভোগ জাতের আমই বেশি। কিন্তু চলতি আম মৌসুমের শুরু থেকেই এবার দফায় দফায় বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন জেলার আমচাষীরা। মৌসুমের শুরুতে আমবাগানগুলোয় এবার ভালো মুকুল এলেও বৈশাখ মাসের চারদফা ভয়াবহ শিলাবৃষ্টিতে মোট উৎপাদনের ৪০ শতাংশ আম ঝড়ে পড়ে।

এরপর নায্যমুল্যে আম বিক্রি করে সেই ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেয়ার কথা ভাবছিলেন আমচাষীরা। কিন্তু সে আশায় এখন গুড়েবালি। কোন কারণ ছাড়ায় এবার স্মরণকালের সবচেয়ে কমদামে আম বিক্রি হচ্ছে চাঁপাইনবাবগঞ্জে। আমবাজারগুলোতে পর্যাপ্ত আমের যোগান থাকলেও ক্রেতা নেই। ফলে পানির দামেই আম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাজারে দেড়মাসেরও বেশি সময় হতে চললো উঠেছে আম। অথচ এখনো বাজার তেমন জমে উঠেনি। এরই মধ্যে শেষ হয়ে গেছে গুটি, গোপালভোগ ও ক্ষিরসাপাত জাতের আম। এখন বাজারে পাওয়া যাচ্ছে, আম্রপালি, বোম্বাই, ল্যাংড়া ও ফজলি জাতের আম। ব্যবসায়ীরা জানান, আর কয়েকদিনের মধ্যেই বাজার দখল করবে আশ্বিনা জাতের আম। কিন্তু বাজারের মন্দাভাব কিছুতেই কাটছেনা।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের দুই প্রধান আমবাজার শিবগঞ্জের কানসাট ও সদর উপজেলার পুরাতন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বাজারে আমের যথেষ্ট যোগান রয়েছে। কিন্তু ক্রেতার অভাবে আম বিক্রি হচ্ছে কম। বর্তমানে ল্যাংড়া বিক্রি হচ্ছে ২০০০ টাকা থেকে ২২০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া ফজলি ১২০০ টাকা, বোম্বাই ১৫০০ টাকা, আম্রপালি ১৮০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে বলে জানালেন ব্যবসায়ীরা। মৌসুমের শুরুর দিকে গোপাল ভোগ ও ক্ষিরসাপাত বিক্রি হয়েছে ৭০০ টাকা থেকে ১২০০ টাকা মণ দরে।

অথচ গত বছর এই সময়ে ক্ষিরসাপাত সাড়ে তিন হাজার টাকা, ল্যাংড়া ২৫০০ টাকা, বোম্বাই ২০০০ টাকা, আম্রপালি ৩০০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হয়েছিলো। গতবছরের চেয়ে অর্ধেকেরও কমদামে আম বিক্রি হওয়ায় ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছেন আম ব্যবসায়ীরা। পুঁজি হারিয়ে ফেলেছেন শতশত আমচাষী। পুরাতন বাজারের খুচরা আম ব্যব্সায়ী শওকত আলী জানান, এখন পর্যন্ত ঢাকা ও চট্রগ্রামের পাইকারদের আনাগোনা দেখা যাচ্ছেনা। ফলে চাহিদা না থাকায় আমের দাম এ বছর খুবই কম।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার আরামবাগের আম ব্যবসায়ী তৌহিদুর রহমান জানান, ২০ বছরের মধ্যে আমের দামে এমন বিপর্যয় কখনো হয়নি। কি কারণে বাজারে ক্রেতা আসছেনা, তা তারা বুঝতে পারছেননা। তিনি জানান, তার ২২ লাখ টাকায় কেনা আমবাগানে শ্রমিক খরচ ও বিষ বাবদ ৭/৮ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। অথচ দেড়মাস ধরে মাত্র চার লাখ টাকার আম বিক্রি করেছেন তিনি।

আজাইপুরের আম ব্যবসায়ী আব্দুর রাকিব জানান, চারদফা শিলাবৃষ্টিতে অর্ধেক আম আগেই নষ্ট হয়ে গেছে। এখন পানির দরে আম বিক্রি হওয়ায় তিনি নিজেই ১২ লাখ টাকা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। আরামবাগের আম ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম জানান, স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে কমদামে আম বিক্রি হওয়ায় ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম চাষীরা। তিনি বলে, ক্ষিরসাপাত আম বাগানেই ১৫০০ থেকে ১৭০০ টাকা মণ দর হিসাব করে কিনেছিলেন ব্যবসায়ীরা। অথচ এই ওই আম বিক্রি করতে হচ্ছে ৭০০ টাকা থেকে ১৫০০ টাকা মণ দরে। তিনি অভিযোগ করেন, দেশের অন্যান্য জেলায় উৎপাদিত আমকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম বলে কম দামে বিক্রি করছেন এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী। যে কারণে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম বাণিজ্যে মন্দাভাব দেখা দিয়েছে।

পুরাতন বাজারের ব্যবসায়ী আব্দুল মতিন জানালেন, রমজান মাসে এমনিতেই আমের চাহিদা কম থাকে। এ বছর আমের ভরা মৌসুম পড়েছে রমজান মাসে। কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার পরেও কেন ক্রেতা নেই-তা তিনি বুঝতে পারছেন না।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ আম আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক রাজু আহমেদ বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সুমিষ্ট আমের খ্যাতি আছে দেশজুড়েই। কিন্তু নানান কারণে আম বাণিজ্যটা ধ্বংসের মুখে পড়েছে। তিনি বলেন, সবচেয়ে ক্ষতি হয়েছে আম পাড়ার জন্য প্রশাসনের সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার ফলে। সময়সীমার বেঁধে দেয়ার কারণে এক থেকে দেড় সপ্তাহের ব্যবধানে সারাদেশের আম বাজারবাত করতে হচ্ছে। এতে ঢাকার আমের মোকামগুলোতে বিপুল পরিমান আম সরবরাহ হওয়ায় দাম কমে যাচ্ছে বলে মত প্রকাশ করেন তিনি।

বাংলাদেশ ম্যাংগো প্রডিওসার মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক আব্দুল ওয়াহেদ জানান, আমের দাম কম হওয়ায় এবার চাঁপাইনবাবগঞ্জের ব্যবসায়ীদের ৫০০ কোটি টাকারও বেশি ক্ষতি হয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী ও চাষী পুঁজি হারিয়ে ফেলেছেন। এই অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত আমচাষী ও ব্যবসায়ীদের আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবী জানান তিনি।


দৈনিক সময় সংবাদ ২৪ ডট কম সংবাদের কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি,আলোকচত্রি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে র্পূব অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সর্ম্পূণ বেআইনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে কোন কমেন্সের জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।


Shares
error: Content is protected !!